আলো ডেস্ক: অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের আট বছরের কারাদন্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে বাবরের জ্ঞাত আয়বর্হিভূতভাবে অর্জিত ২৬ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৮ টাকাসহ তার প্রাইম ব্যাংক গুলশান শাখার মালিকানাধীন ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৯ হাজার ২১৮ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৭ এর বিচারক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৬(২) ধারায় দোষী সাব্যস্তক্রমে তিন বছরের সশ্রম কারাদ- ও একই আইনের ২৭(১) ধারায় দোষী সাব্যস্তক্রমে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেন আদালত। একইসঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাভোগ করতে হবে। তবে এ দুই ধারার সাজা একসঙ্গে চলবে বলে বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন। রায় পর্যবেক্ষণের পর বিচারক বলেন, রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ আইনানুযায়ী (দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪) আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের বিরুদ্ধে বর্তমান মামলাটি আনীত। বিচার পদ্ধতি অনুযায়ী বিচার হয়েছে এবং আসামি উপস্থিত থেকে তার নিয়োজিত কৌঁশলীর মাধ্যমে জেরা করার সুযোগ পেয়েছেন। আসামির বিরুদ্ধে দুদক দুইটি অভিযোগ করেন। এরমধ্যে দুদক আসামির ‘নালিশি বাড়ি’ নির্মাণে ২৬ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৮ টাকার তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূতভাবে অর্জন করার অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয় এবং গুলশান শাখার প্রাইম ব্যাংকের জমাকরা ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৯ হাজার ২১৮ টাকার তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূতভাবে অর্জনের দাবি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। আসামি লুৎফুজ্জামান বাবর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একজন সাবেক আইন প্রণেতা ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী হয়েও সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়ের উৎসের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণভাবে সম্পদ অর্জন করায় তাকে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর যথাক্রমে ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারায় শাস্তি যুক্তিযুক্ত মনে করি। তবে আসামির ১৭ বছর কারাদন্ড এবং অন্য মামলায় মৃত্যুদন্ড প্রাপ্তির বিষয়টি বিবেচনাক্রমে আসামির সম্পদের তথ্য গোপনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৬ (২) ধারায় তিন বছর এবং ২৭ (১) ধারায় পাঁচ বছরের কারাদন্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলাম। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে বাবরকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার পর তাকে আবারও কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। এর আগে গত সোমবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৭ এর বিচারক মো. শহিদুল ইসলাম রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার জন্য এ দিন ধার্য করেন। ২০০৭ সালের ২৮ মে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে যৌথবাহিনীর হাতে আটক হওয়া এ আসামির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের মামলাটি ২০০৮ সালের ১৩ জানুয়ারি রমনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি করেন সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম। তদন্ত শেষে ওই বছরের ১৬ জুলাই দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক রূপক কুমার সাহা আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে বাবরের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ৫ লাখ ৯১ হাজার ৮৯৬ টাকার অবৈধ সম্পদ রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি দুদকে ৬ কোটি ৭৭ লাখ ৩১ হাজার ৩১২ টাকার সম্পদের হিসাব দাখিল করেছিলেন। তার অবৈধ সম্পদের মধ্যে প্রাইম ব্যাংক এবং এইচএসবিসি ব্যাংকে দুটি এফডিআর-এ ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৯ হাজার ২১৮ টাকা এবং বাড়ি নির্মাণ বাবদ ২৬ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৮ টাকা গোপনের কথা উল্লেখ করা হয়। একই বছরের ১২ আগস্ট আসামির বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। মামলায় সাতজন সাক্ষ্য দেন।
রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বাবর: এদিকে, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন বাবরের আইনজীবী। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৭ এর বিচারক মো. শহিদুল ইসলাম রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাবরের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম এ কথা বলেন। তিনি বলেন, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় নেত্রকোনার বারিবাধারায় ২৬ লাখ টাকার যে সাজা দেওয়া হয়েছে সেই টাকা তিনি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করেননি। তদন্ত কর্মকর্তা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকেও এ বিষয়ে পরিষ্কার করেননি যে তিনি টাকা পরিশোধ করেছেন। সুতরাং যে টাকা তিনি দেননি সে টাকায় তথ্য গোপন হতে পারে না। সেই টাকা আদালত বাজেয়াপ্ত করেছেন, কিন্তু যে টাকা তার নেই সেই টাকা কিভাবে বাজেয়াপ্ত করে। তাই আমরা মনে করি এটি একটি অসম্পূর্ণ ও ন্যায়ভ্রষ্ট রায়। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবো। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের দুইটি অভিযোগ ছিলো, একটি হচ্ছে নেত্রকোনাস্থ বারিবাধারা এলাকায় তার একটি বাড়ি ছিল, একটি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি বাড়িটি করেছিলেন। তিনি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে আট লক্ষ টাকা অগ্রিম পরিশোধ করেছিলেন। ইঞ্জিনিয়ার বলেছিলেন এই বাড়ির কাজ হয়েছে প্রায় ৩৪ লাখ টাকার। তারা অ্যাডভান্স পেয়েছিলেন আট লাখ। কিন্তু এই আট লাখ টাকার বাইরে ২৬ লাখ টাকা তিনি পরিশোধ করেনি। তিনি আরও বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা এই বিষয়ে বলেছেন এই আট লাখ টাকার বাইরে কোনো টাকা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার তথ্য আমি পাইনি। কিন্তু বিজ্ঞ আদালত আজকে যে রায়টি দিয়েছেন ২৬ লাখ টাকার তথ্য গোপন সেটা নিশ্চয়ই আদালত সাক্ষীর যে সাক্ষ্যগ্রহণ সেটা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। যেহেতু ২৬ লাখ টাকা আমরা পরিশোধই করিনি সেহেতু এটা আমাদের সম্পদ হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এটা দেনা ছিল, কিন্তু আদালত সেটা হয়তো বুঝতে পারেননি। সে হিসেবে যে রায় আদালত দিয়েছেন সে বিষয়ে আমরা অবশ্যই আপিল করবো। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ ছিল যে, তিনি ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই জেল হাজত থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পদের বিবরণী দাখিল করেছিলেন। কিন্তু তিনদিন পর ২৬ তারিখ তার অ্যাকাউন্টে এইচএসবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর থেকে ১০ লাখ আমেরিকান ডলার তৎকালীন যৌথবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জসিম এই টাকা কোথা থেকে পাঠিয়েছিলেন তা আমরা জানি না। এই টাকার দখল কিংবা মালিকানা আমরা বরাবরই অস্বীকার করে এসেছি। আমরা ট্যাক্স ফাইলে উল্লেখ করেছি এই টাকাটা কোথা থেকে কিভাবে এলো আমার ধারণা নেই। এটা মেজর জসিম ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা মেজর জসিম কিংবা এইচএসবিসি ব্যংকের কোনো কর্মকর্তাকেই সাক্ষী হিসেবে আনেননি। এই অভিযোগ থেকে আমাদের আদালত অব্যাহতি দিয়েছেন। আদালত তাকে দুইটি ধারায় সর্বমোট আট বছরের শাস্তি দিয়েছেন। ২৬ এর ২ ধারায় দিয়েছেন ৩ বছর আর ২৭ এর এক ধারায় দিয়েছেন ৫ বছর। তবে তিনি বলেছেন উভয় সাজা একই সঙ্গে চলবে। সে হিসাবে তার শাস্তির মেয়াদ হয় ৫ বছর। তিনি ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই থেকে জেলে রয়েছেন প্রায় ১৩ বছর। এটিও তার সাজা থেকে বাদ যাবে। সে হিসেবে তার শাস্তি আর থাকছে না। তবুও আমরা এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করি এবং এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করবো। আমরা মনে করি উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিকার পাবো।
