আলো ডেস্ক: কানাডার পর দুবাইয়ে ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানকে শেষ পর্যন্ত দেশেই ফিরতে হয়েছে। পরাববার বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটের দিকে এমিরেটসের ইকে-৫৮৬ নম্বর ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে তিনি। বিমানবন্দরের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গতকাল রোববার সকাল ৮টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে দেশে পৌঁছাবেন মুরাদ হাসান- এমন খবর আসে। তবে বিমানটি ঢাকায় অবতরণ করলেও তিনি এ ফ্লাইটে আসেননি। এর আগে কানাডায় ঢোকার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন ডা. মুরাদ। এরপর সেখান থেকে দুবাইগামী একটি ফ্লাইটে তাকে তুলে দেওয়া হয়।
পরে দুবাইয়ে ঢুকতে না পেরে দেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে খবর পাওয়া যায়। তার দেশে ফেরার খবরে গতকাল রোববার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকরা ভিড় করেন। তবে তিনি ওই নির্ধারিত ফ্লাইটে আসেননি। গত শুক্রবার ডা. মুরাদ হাসান কানাডার বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে দেশটির বর্ডার সার্ভিস এজেন্সি ঢুকতে দেয়নি।
ওইদিন দুপুর দেড়টায় টরেন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে তাকে জানানো হয়, তার সে দেশে প্রবেশে অনেক কানাডিয়ান নাগরিক আপত্তি তুলেছেন। তারপর মুরাদ হাসানকে দুবাইগামী একটি প্লেনে তুলে দেওয়া হয়।
রাজশাহীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা: রাজশাহীর সাইবার ট্রাইব্যুনালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর পদ হারানো সংসদ সদস্য মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বগুড়ার আইনজীবী একেএম সাইফুল ইসলাম।
তিনি বগুড়া জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের উপদেষ্টা এবং বগুড়া জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। গতকাল রোববার সকালে রাজশাহীর সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে এই মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানিয়েছেন আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ইসমত আরা। তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর মন্তব্যের বিষয়টি তুলে ধরে মামলাটি করা হয়েছে। এই মামলায় দু’জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার প্রধান আসামি সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান ও অপরজন মিডিয়া উপস্থাপক মুহাম্মদ মহিউদ্দিন হেলাল নাহিদ। এই মামলায় সাক্ষী হয়েছেন ৫ জন। মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ১ ডিসেম্বর মুরাদ হাসানের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন মিডিয়া উপস্থাপক হেলাল নাহিদ। পরবর্তীতে ওই ভিডিও সাক্ষাৎকারটি সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান তার নিজের ভ্যারিভাইড ফেসবুকে প্রকাশ করেন।
ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি (মুরাদ) জিয়া পরিবার ও ব্যারিস্টার জাইমা রহমান সম্পর্কে অশালীন, নারী বিদ্বেষী, কুৎসিত বর্ণবাদী ও যেকোনো নারীর প্রতি মর্যাদা হানীকর মন্তব্য করেন। এই অবমাননাকর বক্তব্যের জন্য প্রতিমন্ত্রীর ভিডিওটি মুহূর্তেই ফেসবুকের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের মতো বংশীয় পরিবারের নারীর মর্যাদা হানী হয়েছে।
জাইমা রহমানকে নিয়ে মিথ্যা ও বিদ্বেষপূর্ণ তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের কারণে ১২ ডিসেম্বর সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি দায়ের করেছেন। যার ধারা হচ্ছে- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৫/২৯/৩১/৩৫ এর (১) ও (২) ধারা। মামলা প্রসঙ্গে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ইসমত আরা বলেন, বাদী বিএনপির রাজনীতি করেন।
তাই তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। এখন বিচারক মামলাটি আলামত ও অন্যান্য প্রমাণাদি বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক গ্রহণও করতে পারেন আবার বাদও দিয়ে দিতে পারেন। আপাতত মামলা হয়েছে, তাই এই মামলার শুনানি না হলে কিছুই বলা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রামে মামলার আবেদন: ডা. মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম আদালতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার আবেদন করা হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় এ আবেদন করা হয়। বাদী পক্ষের বক্তব্য শুনে মামলার আবেদনের গ্রহণযোগ্যতার শুনানির জন্য ১৫ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত।
গতকাল রোববার চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এস. কে. এম. তোফায়েল হাসানের আদালত এ আদেশ দেন। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের চট্টগ্রাম ইউনিটের সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম বদরুল আনোয়ার বাদী হয়ে মামলাটির আবেদন করেন। মামলায় মুরাদ ছাড়াও বিবাদী করা হয়েছে উপস্থাপক মুহাম্মদ মহিউদ্দিন হেলাল নাহিদ ওরফে নাহিদ হেলালকে।
তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার এটিএম আবুল কাশেমের ছেলে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের চট্টগ্রাম ইউনিটের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাডভোকেট রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ কটূক্তির অভিযোগে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান এমপি ও বিতর্কিত ইউটিউবার মো. মহিউদ্দিন হেলাল নাহিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আদালত মামলাটির এজাহার শুনে প্রথমে আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। কিছুক্ষণ পর আদালত তার আদেশে বলেন- ডা. মুরাদ বর্তমান সংসদ সদস্য।
এ ছাড়া তার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা চট্টগ্রামের বাইরে। তাই তার বিরুদ্ধে এই আদালতে মামলা গ্রহণ করা যাবে কি-না জেলা পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) এবং মহানগর পিপি উভয়ের মতামত সাপেক্ষে ১৫ ডিসেম্বর গ্রহণযোগ্যতার শুনানি হবে। অ্যাডভোকেট রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী আরও বলেন, গত ১ ডিসেম্বর ডা. মুরাদ খালেদা জিয়ার নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান ও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বক্তব্য দেন। যা জিয়া পরিবারসহ নারী সমাজের জন্য মানহানিকর এবং অপমানজনক।
শিষ্টাচার বহির্ভূত এই ভিডিওটি দেশে রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা এবং অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। দেশের জনসাধারণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ফলে দেশে ব্যাপক আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। তাই মামলাটি দায়ের করা হয়। সম্প্রতি নারীর প্রতি অশ্লীল মন্তব্য করে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ হারান ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মুরাদ হাসান।
ফেসবুকে এক লাইভ অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়েকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও ছাত্রলীগ নেত্রীদের নিয়ে বিভিন্ন আপত্তিকর মন্তব্য করেন তিনি। এরপরই চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহির সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হয়। সেখানে মাহির সঙ্গে অশ্লীল ভাষায় কথা বলেন তিনি।
এমনকি মাহিকে ধর্ষণ এবং উঠিয়ে আনার হুমকি দেন। সে সময় চিত্রনায়িকাকে দেখা করার জন্য তাগাদা দিতে থাকেন মুরাদ। তখন ফোনে চিত্রনায়ক ইমনকে প্রতিমন্ত্রী বলছিলেন, ঘাড় ধরে যেন মাহিকে তার কাছে নিয়ে যান। সেই অডিও ভাইরাল হলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন মুরাদ হাসান। পরে তাকে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে ৭ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন মুরাদ হাসান। ওইদিন রাতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।
