আলো ডেস্ক: ময়মনসিংহের ত্রিশালে সড়ক দুর্ঘটনায় মায়ের পেট ফেটে জন্ম নেওয়া শিশুকে এককালীন পাঁচ লাখ টাকা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) দুর্ঘটনাকবলিতদের জন্য গঠিত কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যানকে ১৫ দিনের মধ্যে এই অর্থ শিশুর অভিভাবককে দিতে বলা হয়েছে। ওই শিশুর পরিবারকে কেন যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট।
সংশ্লিষ্টদের এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টের বিচারপতি খিজির আহেমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ মাহাসিব হোসেন। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতিকার চাকমা। তার সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ রেজাউল করিম ও মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন।
এরপরে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী সড়ক দুর্ঘটনা আইনে বিআরটিএ দুর্ঘটনাকবলিতদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট আছে বলে জানিয়েছেন হাইকোর্টকে। শুনানি শেষে আদালত আদেশ দিলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুার্টি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতিকার চাকমা বলেন, ‘বিআরটিএ’ সড়ক দুর্ঘটনা আইনে বিআরটিএ দুর্ঘটনাকবলিতদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করলেও তাদের কোনো তহবিল নেই। এ সময় হাইকোর্ট বলেন, বিআরটিএ কোটি কোটি টাকা আছে। এ বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী সৈয়দ মাহসিব হোসেন বলেন, বিআরটিএ দুর্ঘটনাকবলিতদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করলেও তাদের কোনো তহবিল নেই। কিন্তু আদালত বিআরটিএর কোটি কোটি টাকা আছে বলেছেন, কারণ আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ফি ও ট্যাক্স নিয়ে থাকেন।
তাই বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কাছে টাকা আছে এমন প্রেক্ষাপটে আদালত বলেছেন। এর আগে ট্রাকচাপায় মায়ের পেট ফেটে জন্ম নেওয়া শিশুর মা-বাবা এবং বোন নিহতের বিষয়ে তদন্ত চেয়ে করা রিট করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তার লালন-পালনের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং কল্যাণ নিশ্চিত করার নির্দেশনা চেয়ে রিট করা হয়েছে।
গত সোমবার জনস্বার্থে আইনজীবী কানিজ ফাতেমার পক্ষে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ মাহাসিব হোসেন। রিটে দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ট্রাক মালিকের কাছ থেকে কী কী সহযোগিতা করা যায় তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক পরিবহন সচিব, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিকে (বিআরটিএ) বিবাদী করা হয়েছে। এর আগে রোববার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মাহাসিব হোসেন বিষয়টি হাইকোর্টে উপস্থাপন করেছিলেন। ওইদিন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের বেঞ্চে বিষয়টি উত্থাপিত করা হয়।
এর আগে শনিবার দুপুরের দিকে উপজেলার রাইমনি গ্রামের ফকির বাড়ির মোস্তাফিজুর রহমান বাবলুর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৪০) তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রত্না বেগম (৩০) ও মেয়ে সানজিদাকে (৬) নিয়ে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে ত্রিশালে আসেন। পৌর শহরের খান ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে রাস্তা পারাপারের সময় ময়মনসিংহগামী একটি ট্রাক তাদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই জাহাঙ্গীর আলম ও স্ত্রী রত্না বেগম মারা যান। মেয়ে সানজিদা আক্তার গুরুতর আহত হয়। এ সময় ট্রাকচাপায় রত্না বেগমের পেট ফেটে কন্যাশিশুর জন্ম হয়। পরে আহত সানজিদা ও নবজাতককে নিয়ে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সানজিদাকে মৃত ঘোষণা করে নবজাতক শিশুটিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। তবে অতিরিক্ত যানজটের কারণে নবজাতককে চুরখাই কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে ময়মনসিংহ মহনগরীর চরপাড়া এলাকায় লাবিব হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই নবজাতক বর্তমানে ওই হাসপাতালেই আছে। রত্না আক্তার রহিমার নবজাতক ও অন্য দুই সন্তানের সহায়তা হিসাব নম্বর সোনালী ব্যাংকের ৩৩২৪১০১০২৮৭২৮, হিসাবটি ইউএনও এবং নবজাতক শিশুর দাদা ও দাদি পরিচালনা করবেন বলে জানানো হয়েছে। এদিকে সহায়তার জন্য খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৪৩ হাজার টাকা জমা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আক্তারুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দুপুরের পরে ব্যাংক স্টেটম্যান্ট নিয়েছি। সেখান দেখা যায়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার পর থেকে ৪৩ হাজার টাকা জমা পড়েছে। আশা করছি, আরও টাকা জমা পড়বে। এরআগে গত সোমবার বিকেলে সোনালী ব্যাংকের ত্রিশাল শাখায় রত্না আক্তার রহিমার নবজাতক ও অপর দুই সন্তানের সহায়তায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। ওই ব্যাংক হিসাব নবজাতকের দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু, তার স্ত্রী সুফিয়া বেগম এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আক্তারুজ্জামান পরিচালনা করতে পারবেন।
নবজাতকটির দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বলেন, ওই নবজাতক ছাড়াও এবাদত (৮) ও জান্নাত আক্তার (১০) নামে আমার আরও দুই নাতি আছে। ওদের জন্য প্রশাসন একটি অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছে। দেশবাসী যদি সহায়তা করে তাহলে আমার নাতিদের মানুষের মতো মানুষ করে তুলবো। এদিকে ঘাতক ট্রাকচালক রাজু আহমেদ শিপনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গত সোমবার রাতে ঢাকার সাভার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সহকারী পরিচালক সিনিয়র এএসপি আ ন ম ইমরান খান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
