আলো ডেস্ক: সমাজ ও রাষ্ট্রে সা¤প্রদায়িক সহিংসতা-উসকানি এবং নারীর প্রতি সহিংস আচরণ বন্ধ করাসহ সব মানুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় ১০ দফা দাবি তুলে ধরেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনের নেতারা সা¤প্রদায়িক সহিংসতা ও উসকানিমূলক ঘটনাসমূহের প্রকৃত অপরাধী ও ইন্ধনদাতাদের নিরপেক্ষভাবে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার ও যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সাপেক্ষে শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়ায় নারীর প্রগতি, সমঅধিকার, নারীর প্রতি সহিংস আচরণ বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে আরও জটিল হয়ে উঠছে। যা নারীর মানবাধিকার প্রশ্নে উদ্বেগজনক।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সংগঠনের সুফিয়া কামাল ভবন মিলনায়তনে “অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি বিনষ্টের অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বক্তব্য” বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব কথা বলেন। মহিলা পরিষদ নেতারা বলছেন, সংবিধানে সব মানুষের সমঅধিকারের কথা বলা হলেও গত কয়েক দশক ধরেই সাম্প্রদায়িক হামলা ও বিভিন্ন ধরনের সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতার ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটেই চলেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের সাম্প্রদায়িক চেতনাকে স্লান করে দিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সংগঠনের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি রেখা চৌধুরী। তিনি বলেন, আমরা সবাই বাঙালি- এ চেতনার আলোকেই ১৯৭১ সালে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসীসহ সব নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনি এ সময় সাম্প্রতিক কয়েকটি সাম্প্রদায়িক ইস্যু নিয়ে সংঘটিত ঘটনার উল্লেখ করে এসব ঘটনাসমূহকে বাইরে থেকে ‘বিচ্ছিন্ন’ মনে হলেও প্রতিটি ঘটনা ‘সাম্প্রদায়িকতার সুঁতোয় বাঁধা’ বলে দাবি করেন।
রেখা চৌধুরী বলেন, একশ্রেণির উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী ইচ্ছে করেই এবং অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এসব ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের স্বরূপ উন্মোচন হচ্ছে না। তাদের শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে না। বরং নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী এবং ভিন্ন মতবাদের মানুষ ও মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য যে ধরণের পরিসর থাকা প্রয়োজন তা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক, নারী-পুরুষের সমতাপূর্ণ, যুক্তিবাদী সমাজ দেখতে চায়। যে সমাজে সব মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকে। কিন্তু বাস্তবে এর বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের অর্থনৈতিক সূচকে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।
সবক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে উন্নয়নের ছোঁয়া নিজের জীবনে কোথায় তা সকলের জন্য ভাবার সময় এসেছে। তিনি বলেন, উগ্র মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নানা ক‚টকৌশল অবলম্বন করে উন্নয়নের ক্ষেত্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এমতাবস্থায় নাগরিক সমাজ ও নারী আন্দোলনের ভ‚মিকা নির্ধারণের সময় এসেছে। ক্ষমতাবানরা একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা সুবিধা নিচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়েছে। এসব পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশ গড়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্র পরিচালক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজকে সোচ্চার হতে আহবান জানিয়ে সুশাসন ও সমতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। মহিলা পরিষদের ১০ দাবির মধ্যে রয়েছে-
১. যে কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও উস্কানিমূলক ঘটনাসমূহের প্রকৃত অপরাধী ও ইন্ধনদাতাদের নিরপেক্ষভাবে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার ও যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ সাপেক্ষে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।
২. সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে।
৩. সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাসমূহ ঘটানো হচ্ছে সে বিষয়ে যথাযথ তদন্তপূর্বক অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৫. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করে সঠিক ও যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।
৬. রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
৭. ধর্মীয় সমাবেশ বা ওয়াজ মাহফিল থেকে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ এবং নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ধরণের অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে।
৮. ’৭২ এর সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৯. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক, অসা¤প্রদায়িক সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়তে হলে আজকে সরকারি দলসহ সব রাজনৈতিক দলকে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
১০. সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় রেখে মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলাম যুগোপযোগী করতে হবে এবং যত্রতত্র মাদ্রাসা নয়, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
