নওগাঁ প্রতিনিধি
নওগাঁ শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে ছোট যমুনা নদী। এই নদীকে কেন্দ্র করে জেলা শহরসহ নদীর পাড়ে গড়ে অনেক জনপদ ও হাটবাজারসহ লোকালয়। গড়ে ওঠা এসব জনপদে খুঁজে পেয়েছিলেন জীবন-জীবিকার পথ। এই নদীতে এক সময় ঢেউয়ের তালে চলাচল করেছে অসংখ্য পালতোলা নৌকা। কিন্তু নদীর অবস্থা বর্তমানে খুবই শোচনীয়। বর্ষকালে পানির প্রবাহ থাকলেও শুকনা মওসুমে প্রতি বছর পানি শুকিয়ে যায়। সময়ের বির্ততনে এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে নদীটি।
বছরে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাস পানি থাকে এসব নদীতে। অন্য সময়গুলোতে নদীটি ধুধু বালুচরে পরিণত হয়। এখন অতি সহজে মানুষ বাস, ট্রাক যোগে স্বল্প সময়ে পৌঁছে যাচ্ছে তাদের গন্তব্যে। সহজেই তারা তাদের বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করতে পারছে। এখন নদীপথের প্রয়োজন অনেকটাই ফুরিয়ে যাওয়ার ফলে এই নদীটি হারিয়ে ফেলেছে তার জৌলস। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির তোড় ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদীটি তার পূর্ণ যৌবন ফিরে পেলেও খরা মৌসুম মাস আসতে না আসতেই নদীটি মরা খালে পরিণত হয়। যেন তার যৌবন হারিয়ে ফেলে নদীটি। খরা মৌসুমে হঠাৎ কেউ দেখলে মনেই হবে না এটি একটি নদী।
শহরের তাজের মোড়ের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা এবিএম রফিকুল ইসলাম বলেন, নওগাঁর ছোট যমুনা নদীতে এক সময় ঢেউয়ের তালে পাল তোলা নৌকা চলাচল করেছে। এইতো প্রায় ২০-২৫ বছর আগের কথা। নদীর পানি ব্যবহার করে ধান, গম, সবজি চাষ, বাড়ীর কাজ, কাপড় ধোয়াসহ সকল কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অথচ বর্তমানে বছরের অর্ধেক সময় পানি থাকে না। নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য যতাযত কৃর্তপক্ষের আরো সচেতন হওয়া এবং সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।
শহরের লাটাপাড়া, সুলতানপুর ও জেলপাড়ার মৎস্যজীবী রথিন্দ্রনাথ রায়, ধিরেন চন্দ্র, অখিল প্রামানিকসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ছোট যমুনা নদীতে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পানি না থাকেনা। যার কারনে মাছ ধরতে পারিনা আমরা। এর ফলে এ এলাকার অনেক মৎস্যজীবীরা চরম সংকটে পড়ে যায়। পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে ইতো মধ্যে অনেক মৎস্যজীবী পূর্বপুরুষদের আদি পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিবেশবিদ শরীফুল ইসলাম খানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আশির দশক জুড়েই নওগাঁর এই ছোট যমুনা নদীর প্রানবন্ত ভরা যৌবন ছিল। দিন দিন ক্রমেই যৌবন হারাতে বসেছে নদীটি। এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে নদীটির আর হারানোর কিছুই নেই। সরু মরা খালে পরিণত হয়েছে। ভরা যৌবনে যমুনার নদীর ঢেউয়ের তালে চলাচল করত পাল তোলা অসংখ্য নৌকা। এ নদীকে অবলম্বন করে অসংখ্য মানুষ ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন জীবীকার সহজ পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। বর্তমানে ছোট যমুনা নদীটি ভয়াবহ দূষণের শিকার হয়েছে। এতে ভরাট হয়ে স্বাভাবিক নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হলে নওগাঁর জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান বলেন, ইতিমধ্যে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরাতে মন্ত্রণালয় বরাবার একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। যাতে ছোট যমুনা নদী খনন করে এর পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ে। সেই সঙ্গে কৃষকরা নদীর পানি ব্যবহার করে সেচ কার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে। আশা করছি প্রস্তাবনা পাস হলেই দ্রুত কাজ শুরু হবে।
নদীর দুই পাশে গড়ে ওঠা বয়লারের ছাই, ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলে নদীর তলদেশ ভরাট ও জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যমেও আমরা কাজ করছি যাতে নদীর পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে। তবে বয়লারের ছাই ও ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলে নদীর তলদেশ ভরাট করা হচ্ছে এমন অভিযোগ পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
