আলো জা তী য় ডেস্ক: ঢাকার বোট ক্লাবে পরীমনিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা মামলায় ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (চার্জগঠন) শুনানির জন্য ১৯ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ এর বিচারক হেমায়েত উদ্দিন এ দিন ধার্য করেন। এদিন পলাতক আসামি শহীদুল আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল।
তিনি ধার্য তারিখের আগেই এ মামলায় জামিন নেন। এ ছাড়া তিন আসামি গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দেন। গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ এর বিচারক হেমায়েত উদ্দিন চার্জশিট গ্রহণ করেন। ওইদিন আসামি শহীদুল আলম পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
একই সঙ্গে গ্রেপ্তার সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ৩ মার্চ দিন ধার্য করেন। ২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কামাল হোসেন ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নাসিরসহ তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেন। ওই বছরের ১৪ জুন ধর্ষণ-হত্যাচেষ্টার অভিযোগে নাসির উদ্দিন ও তার বন্ধু অমির নাম উল্লেখ করে এবং চারজনকে অজ্ঞাত আসামি করে পরীমনি ঢাকার সাভার থানায় মামলা করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয় পুলিশ।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ৮ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার বনানীর বাসা থেকে কস্টিউম ডিজাইনার জিমি (৩০), অমি (৪০) ও বনিসহ (২০) দুটি গাড়িতে করে তারা উত্তরার উদ্দেশে রওনা হন। পথে অমি বলে বেড়িবাঁধের ঢাকা বোট ক্লাবে তার দুই মিনিটের কাজ আছে। মঅমির কথামতো তারা সবাই রাত আনুমানিক ১২টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকা বোট ক্লাবের সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড় করায়। কিন্তু বোট ক্লাব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অমি কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
তখন ঢাকা বোট ক্লাবের সিকিউরিটি গার্ডরা গেট খুলে দেয়। অমি ক্লাবের ভেতরে গিয়ে বলে এখানকার পরিবেশ অনেক সুন্দর, তোমরা নামলে নামতে পারো। এজাহারে আরও বলা হয়, তখন আমার ছোট বোন বনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বোট ক্লাবে প্রবেশ করে ও বারের কাছের টয়লেট ব্যবহার করে। টয়লেট থেকে বের হতেই এক নম্বর বিবাদী নাসির উদ্দিন মাহমুদ আমাদের ডেকে বারের ভেতরে বসার অনুরোধ করেন ও কফি খাওয়ার প্রস্তাব দেন।
আমরা বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলে অমিসহ এক নম্বর আসামি মদপানের জন্য জোর করেন। আমি মদপান করতে না চাইলে এক নম্বর আসামি জোর করে আমার মুখে মদের বোতল প্রবেশ করিয়ে মদ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। এতে আমি সামনের দাঁতে ও ঠোঁটে আঘাত পাই। এক নম্বর আসামি (নাসির উদ্দিন মাহমুদ) আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন ও আমার শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করেন এবং আমাকে জোর করে ধর্ষণের চেষ্টা করেন।
তিনি উত্তেজিত হয়ে টেবিলে থাকা গ্লাস ও মদের বোতল ভাঙচুর করে আমার গায়ে ছুড়ে মারেন। তখন কস্টিউম ডিজাইনার জিমি নাসির উদ্দিন মাহমুদকে বাধা দিতে গেলে তাকেও মারধর করে জখম করেন। এজাহারে পরীমনি আরও বলেন, আমি প্রথমে জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ নম্বরে ফোন দিতে গেলে আমার ফোনটি কেড়ে নিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এ সময় দুই নম্বর আসামিসহ অজ্ঞাতনামা চারজন এক নম্বর আসামিকে ঘটনা ঘটাতে সহযোগিতা করেন।
আমি অজ্ঞাতনামা আসামিদের দেখলে শনাক্ত করতে পারবো। তিনি আরও বলেন, দুই নম্বর আসামি অমি পরিকল্পিতভাবে আমাকে বর্তমান বাসা থেকে ঢাকা বোট ক্লাবে নিয়ে যান। তিনি অজ্ঞাতনামা চারজন আসামি ও নাসির উদ্দিন মাহমুদ আমার শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করে ও জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করে। আমি আমার সঙ্গীদের সহায়তায় ধর্ষকের হাত থেকে রক্ষা পাই। রাত আনুমানিক ৩টায় আমি আমার গাড়িতে প্রায় অচেতন অবস্থায় অপর সঙ্গীদের সহায়তায় বাসায় ফিরে আসি।
মাদক মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের নোট অ্যাটর্নি কার্যালয়ে: এদিকে পরীমনির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বনানী থানায় দায়ের করা মামলা তিন মাসের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করবে রাষ্ট্রপক্ষ। সেই লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নোট জমা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার পরীমনির এ মামলা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ ও মামলা কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত।
বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. সেলিমের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, পরীমনির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা মামলা তিন মাসের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করবো রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। এজন্য অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নোট জমা দেওয়া হয়েছে। এখন আপিল প্রস্তুতির পালা, এর মধ্যে যতদিন সময় লাগে।
সেটা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। গত ৫ জানুয়ারি তিনজনের মামলা বাতিলের আবেদন খারিজ করে ঢাকার ১০ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের অভিযোগ গঠন করেন। এরপর ৩০ জানুয়ারি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ ধারায় আবেদন করেন পরীমনি। মামলার অন্য দুই আসামি হলেন- আশরাফুল ইসলাম দিপু ও কবির হোসেন। ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর পরীমনিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ।
একই সঙ্গে মামলাটি বিশেষ জজ আদালত ১০-এ বদলি করা হয়। ওই বছর ৪ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক কাজী মোস্তফা কামাল আদালতে পরীমনিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। একই বছরের ৩১ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ শুনানি শেষে প্রতিবেদন দাখিল হওয়া পর্যন্ত পরীমনির জামিন মঞ্জুর করেন।
পরদিন গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্ত হন এই নায়িকা। ২০২১ সালের ৪ আগস্ট পরীমনিকে তার বনানীর বাসা থেকে আটক করে র্যাব। পরদিন ৫ আগস্ট বিকেলে পরীমনি, চলচ্চিত্র প্রযোজক রাজ ও তাদের দুই সহযোগীকে বনানী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর র্যাব বাদী হয়ে বনানী থানায় পরীমনি ও তার সহযোগী দীপুর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে।
সেই মামলায় পরীমনিকে আদালতে হাজির করা হলে প্রথমে চারদিনের রিমান্ড ও পরে আরও দুই দফায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। মামলা সূত্রে জানা যায়, পরীমনি ২০১৬ সাল থেকে মাদকসেবন করতেন। এজন্য বাসায় একটি ‘মিনিবার’ তৈরি করেন। সেখানে নিয়মিত ‘মদের পার্টি’ করতেন। চলচ্চিত্র প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজসহ আরও অনেকে তার বাসায় অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের সরবরাহ করতেন ও পার্টিতে অংশ নিতেন।
