স্টাফ রিপোর্টার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে আগামীকাল সোমবার। তিন দিনব্যাপী শুরু হওয়া এই পরীক্ষা চলবে আগামী ০৬ অক্টোবর পর্যন্ত। চলতি বছর তিনটি ইউনিটের ১ লাখ ২৮ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষা অংশ নিচ্ছেন । পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ইতোমধ্যে সকল প্রস্তুতি শেষ করেছে রাবি প্রশাসন। তবে এই ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে একাধিক জালিয়াতি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, জালিয়াতি রোধে তারা তৎপর রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আসন্ন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় রয়েছে জালিয়াতি চক্রের বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত রয়েছেন। চক্রের সদস্যরা প্রক্সি ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অসদুপায়ে ভর্তীচ্ছুদের পরীক্ষায় চান্স পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে ভর্তি পরীক্ষার আগ মুহূর্তে এক ছাত্রলীগ নেতার ফোনালাপ ফাঁস হয়। যেখানে ভর্তীচ্ছুকে ওই ছাত্রলীগ নেতা টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। তাদের মধ্যে আড়াই লাখ টাকার চুক্তি হয়।
এর আগে, ২০১৪ সালের ভর্তি পরীক্ষার সময় ঢাকা থেকে এক্সপার্টদের একটি গ্রুপ পরীক্ষায় জালিয়াতির উদ্দেশে মাইক্রোবাসে রাজশাহীতে আসেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে বিষয়টি জানতে পেরে তৎক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হয়। পরে তাদের ওই গাড়িতেই রাজশাহী থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোলাইমান চৌধুরী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রায়ই শুনি পরীক্ষা অসদুপায় অবলম্বনের জন্য রাজশাহীর বাইরে থেকে এই চক্রকে আনা হয়। প্রশাসনের একটি দায়িত্বে থাকার কারণে বিষয়গুলো খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তিনি মনে করেন, এই চক্র দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সর্তক থাকা খুব জরুরী।
প্রক্সি দিতে রাজধানী থেকে আসে এক্সপার্ট:
দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত কয়েক দশকে এমন অভিযোগ পাওয়া যায় নি। তবে এখানে ভর্তি জালিয়াতির অন্যতম প্রক্রিয়া হচ্ছে প্রক্সি। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে তার জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে বিশেষ অ্যাপসের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ছবি পরিবর্তন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা জালিয়াতি চক্রের সদস্যদের কাছে এক্সপার্ট হিসেবে পরিচিত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাবিতে প্রক্সি দিতে আসা এক্সাপার্টদের অধিকাংশই ঢাকা থেকে আসেন। এছাড়া কিছু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছে। পরীক্ষা প্রতি একজন এক্সপার্ট পায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা ।
নজরদারিতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বেশ কয়েকজম নেতাকর্মী রয়েছেন :
এদিকে আসন্ন ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ভর্তি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এমন অন্তত দেড় ডজন নেতাকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর নজরদারি করছে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, দেড় ডজন এই নেতকর্মীর মধ্যে ছাত্রলীগের যুগ্ম-সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সম্পাদক ও একাধিক ছাত্রলীগ কর্মীর নাম রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্য বলেন, ভর্তি জালিয়াতির সাথে সক্রিয় থাকতে পারে এমন একাধিক ব্যক্তির ওপর আমাদের নজরদারি রয়েছে। যে তালিকায় ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলছেন, তার জানা মতে কোনো ছাত্রলীগ নেতাকর্মী জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত নাই। তিনি বলেন, যদি কেউ জড়িত থাকে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিবো।
এদিকে, ভর্তি পরীক্ষায় সব ধরনের জালিয়াতি ঠেকাতে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোড়দার করা হয়েছে। মোতায়ন করা হয়েছে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। ক্যাম্পাসে তাদের বেশ তৎপরতা দেখা গেছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, জালিয়াতি ঠেকাতে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। সবকিছুই এখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছেন বলে তিনি জানান।
