রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রশাসনের অনুরোধে সাত দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে তাদের কর্মবিরতি স্থগিত করেছেন। তাদের দুটি প্রধান দাবি হলো: চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ও ২০ সেপ্টেম্বর সংঘটিত ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা (পোষ্য কোটা) পুনর্বহাল করা। তবে, শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের শিক্ষকরা তাদের শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুই দফা দাবি জানিয়ে ৭ দিনের আলটিমেটাম দিয়ে ‘পূর্ণাঙ্গ শাটডাউন’ কর্মসূচি স্থগিত করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বুধবার দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ ঘোষণা দেন রাবি অফিসার্স সমিতির সভাপতি মোক্তার হোসেন। দাবিগুলো হলো-২০ সেপ্টেম্বর সংঘটিত ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা (পোষ্য কোটা) পুনর্বহাল করা। এদিকে শিক্ষকদের লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি (ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ) অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। কর্মবিরতির কারণে বুধবার চতুর্থ দিনের মতো অচল ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম। শাটডাউনের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে মানববন্ধন করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটা পুনর্বহাল ও উপ-উপাচার্য, প্রক্টরসহ অন্যান্য শিক্ষক-কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিতের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ৭ দিনের সময় বেঁধে (আলটিমেটাম) দিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক চত্বরের সামনে কর্মকর্তাদের পক্ষে অফিসার্স সমিতির সভাপতি মোক্তার হোসেন সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।
শাটডাউন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনের আমন্ত্রণে আমরা আলোচনায় বসেছিলাম। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন এবং আহ্বান জানিয়েছেন প্রশাসন ও একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখার স্বার্থে কয়েকদিন যেন সময় দেওয়া হয়। সেই বিবেচনায় আমরা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যদূরীকরণ ও ২০ সেপ্টেম্বর সহ-উপাচার্যসহ অন্যান্যদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের জন্য ৭ দিনের সময় দিতে চাই। ৭ কর্মদিবসের মধ্যে যদি সন্ত্রাসীদের বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া না হয়, আমরা আরও বৃহত্তর ও কঠিন কর্মসূচি গ্রহণ করব।
মোক্তার হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সেই কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেজন্য প্রশাসন এককভাবে দায়ী থাকবে। প্রশাসনের অনুরোধেই বুধবার দুপুর ১টা থেকে আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব শাটডাউন কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করছি।
এদিকে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় সন্ত্রাসীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত সব সাধারণ শিক্ষকদের পূর্ণদিবস কর্মবিরতি চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল আলিম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিবাদে বিগত ৪ দিন ধরে আমাদের কর্মবিরতি চলছে। আমরা প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখার মতো কিছু পাইনি। আমরা সাধারণ শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব করি এবং সাধারণ শিক্ষকদের ব্যানারেই আন্দোলন করছি। সাধারণ শিক্ষকদের সবাই ওই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান। তারা আমাদের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন এবং এর ফলেই তারা ক্লাস-পরীক্ষা নিচ্ছেন না। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই আমাদের আন্দোলন চলছে, চলবে।
এদিকে শাটডাউনের প্রতিবাদে রাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনের সড়কে মানববন্ধন করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। বেলা ১১টা থেকে ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রিটারি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, টানা তৃতীয়বারের মতো পেছানো হয়েছে রাকসু নির্বাচন। সিন্ডিকেট মিটিংয়ে পোষ্য কোটা আপাতত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তার মানে আবারও ১৬ অক্টোবরের আগে পোষ্য কোটার মতো একটা মীমাংসিত ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসে রাকসু নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হতে পারে। আর সেই হালে বাতাস দিচ্ছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলো। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই ষড়যন্ত্র আর মেনে নেবে না। রাকসু নির্বাচন যদি না হয় তাহলে এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং যারা রাকসু পেছানোর আন্দোলনের ফাঁদে পা দিয়েছিল, তাদের কাউকেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষমা করবে না।
মাবববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে রাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী আ. নূর বলেন, গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের টাকা প্রশাসনকে লিচুতলায় বসে থাকার জন্য দেওয়া হয় না। আমাদের শিক্ষার অধিকার হরণ করা হয়েছে। অনতিবিলম্বে আমাদের ক্লাসরুম-লাইব্রেরি খুলে দিন এবং শিক্ষার অধিকার ফিরিয়ে দিন।
বাতিল হওয়া পোষ্য কোটা ১৮ সেপ্টেম্বর ১০ শর্তে ফিরিয়ে আনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। একপর্যায়ে শনিবার জুবেরী ভবনে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি হয়। এ ঘটনার পর রোববার জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম ও কর্মকর্তারা পোষ্য কোটা পুনর্বহাল ও শিক্ষক লাঞ্ছনাকারীদের শাস্তির দাবিতে এক দিনের কর্মবিরতি পালন করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রোববার বিকালে জরুরি সিন্ডিকেট সভা হয়। এরপর পাঁচ সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি এবং নিরপেক্ষ বিচারের স্বার্থে বিচার বিভাগীয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরদিন সোমবার থেকে শিক্ষক-কর্মচারীরা অনির্দিষ্টকালের ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন।
গতকাল সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলকের সামনের লিচুতলায় চেয়ার পেতে বসেছেন কর্মবিরতিতে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন, একাডেমিক ভবনসহ সব শ্রেণিকক্ষ ও দপ্তরেই তালা ঝুলছে। ব্যস্ততম পরিবহণ ও টুকিটাকি চত্বরে মানুষের আনাগোনা কম। ক্যাম্পাসের বেশির ভাগ ভ্রাম্যমাণ খাবার ও চায়ের দোকান বন্ধ রয়েছে।
