আলো ডেস্ক
সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের জামিনের পথে অদৃশ্য বাধা এবং তাঁর পক্ষে যোগ্য আইনি লড়াইয়ের পথ উন্মুক্ত করার বিষয়ে বর্তমান প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদকে খোলা চিঠি দেওয়া হয়েছে।
রবিবার (৩ আগস্ট) মুক্তিযোদ্ধা, মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম মাসুম বিল্লাহ তাদের নিজ নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এ খোলা চিঠি পোস্ট করেন।
খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘ইওর এক্সিলেন্সি, আমাদের সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা জানবেন। আইনি সৌভ্রাতৃত্বের সদস্য ও দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা দুজন আপনাকে এই উন্মুক্ত চিঠি লিখছি। আপনি এই চিঠি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিচারিকভাবে, অথবা প্রশাসনিকভাবে আমলে নিয়ে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। প্রতিষ্ঠিত বিচারিক সিদ্ধান্তে, এরকম চিঠি আমলে নেওয়ার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে। আপনার মাধ্যমে আমরা উচ্চ আদালতের অন্যান্য বিচারপতি মহোদয়দেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
‘কিন্তু সহ-বিচারকদের সহযোগে শুদ্ধ রায় দেওয়ার কারণে বা এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক অর্ধসত্য-অসত্য মিলিয়ে মামলা দিয়ে তাঁকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে— তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। মানবিক অভিজ্ঞান বলে যে, এটি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ন্যায়পরিচালন ব্যবস্থার জন্য একটি অশনি সংকেত হয়ে দেখা দেবে।’
‘বিচারকদের সুরক্ষার সুপ্রতিষ্ঠিত যেসব বিধিবদ্ধ বা কমন ’ল নীতি রয়েছে, কোনও (প্রধান) বিচারপতির গ্রেফতার তাঁর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই এ ঘটনা আমাদের বিচারিক সংস্কৃতিতে এক কলঙ্কের তিলক হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ ঘটনাটি আপনার বিবেককেও আচ্ছন্ন করেছে বলে আমাদের বিশ্বাস।’
পোস্টটিতে আরও লেখা হয়েছে, ‘আপনার গৌরবজ্জ্বল পারিবারিক ঐতিহ্য, আপনার প্রজ্ঞা ও বিচারিক পাণ্ডিত্যের প্রতি আমাদের অনেক সমীহ রয়েছে। আপনি সমগ্র বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। আপনি জানবেন যে, বিচার শুধু করলেই চলে না, দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে এবং প্রাচুর্যপূর্ণভাবে প্রতিভাত হতে হয় যে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে।’
‘রাষ্ট্রের দুজন সচেতন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনার কাছে আমরা নিবেদন করছি যে, সাবেক প্রধান বিচারপতি জাস্টিস খায়রুল হকের বিরুদ্ধে আনা এ মিথ্যা মামলা রহিত করার জন্য আপনি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।’
‘আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অন্যতম অনুশীলনকারী হচ্ছে বিচার বিভাগ। সুতরাং, নির্বাহী বিভাগের এ স্বেচ্ছাচারিতার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সার্বভৌম বিচারিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে আপনার প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার রয়েছে। সেটিই প্রকৃতপক্ষে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনুশীলনের অন্যতম মানদণ্ড।’
‘আপনি সেটি দ্রুত করে দেখাবেন এ বিশ্বাস আমরা করতে চাই।’
‘এটি যদি না করা যায়, তাহলে আগামী দিনের রাজনৈতিক পরম্পরায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা কখনোই সুরক্ষিত থাকবেন না। এবং এক অর্থে ভাবলে দেখা যাবে যে, এরূপ ঘটনার প্রভাব আরো সুদূরপ্রসারী। আত্মঅবমানে, স্বয়ং বিচারকরা, আস্থা সংকটে ভুগবেন এবং নিজেদেরকে আর বিশ্বাস করতে পারবেন না। তাছাড়া, বাংলাদেশে আইনি পঠন-পাঠন, গবেষণা ও চিন্তায় এটি একটি স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করবে। এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুক্তিযুদ্ধের মহান লক্ষ্য সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, সুনাম, আইনের শাসন ও অন্যান্য মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’
‘নিশ্চয়ই এ বিষয়ে আপনি সচেতন রয়েছেন। সার্বভৌম সংসদের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সভ্যদের কাছে এ ব্যাপারে আমাদের আর কোনও প্রত্যাশা অবশিষ্ট নেই।’
‘আমরা আপনার মুখের দিকে চেয়ে আছি। আপনি নিদেনপক্ষে বিচারপতি খায়রুল হকের জামিনের পথের অদৃশ্য বাধাগুলোতে নজর দিন এবং তাঁর পক্ষে যোগ্য আইনি লড়াই হবার পথ উন্মুক্ত করুন। তাহলে আমরা আইনের শাসনকে প্রতিপালিত হতে দেখবো।’
‘আধুনিককালে আইন একটা প্রসেস। সেজন্য, আমরা গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক মানস থেকে দেখার জন্য আগ্রহী থাকবো যে, আপনার নেতৃত্বে বিচারবিভাগ সেই বিচারিক কার্যক্রম কিভাবে নিষ্পন্ন করেন।’
খোলা চিঠির শেষে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনায় করেন মুক্তিযোদ্ধা, মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম মাসুম বিল্লাহ।
