সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। কিন্তু বাংলাদেশে শিল্প খাত বর্তমানে মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে, যার প্রধান কারণ গ্যাসের সংকট ও মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের অভাবে শিল্পকারখানাগুলো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, যা শিল্প খাতের টিকে থাকার জন্য হুমকিস্বরূপ। তার ওপর নতুন করে গ্যাসের ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাব শিল্পোদ্যোক্তাদের আরও গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) ১৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে নতুন ও প্রতিশ্রুত গ্রাহকদের জন্য গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। এতে করে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে এবং প্রতিযোগিতার বাজারে দেশি শিল্প উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়বেন। শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, এতে কর্মসংস্থান কমে যাবে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করে তুলবে।
গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ভালুকা ও নরসিংদীসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সিরামিক ও স্টিল শিল্পে উৎপাদন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
নতুন বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। শিল্প মালিকরা মনে করেন, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির পরিবর্তে সরকারের উচিত সিস্টেম লস কমানো এবং গ্যাস সরবরাহে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। বর্তমানে তিতাস গ্যাসের সিস্টেম লস ১৩.৫৩ শতাংশ, যা যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কমানো সম্ভব।
এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানি বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা জরুরি। এলএনজি আমদানিতে দ্বৈত ভ্যাট ও উৎসে কর প্রত্যাহার করেও গ্যাসের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। একদিকে শিল্প উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
২০২৩ সালে শিল্প জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৭.২৮ শতাংশে নেমে এসেছে এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ছয় মাসে ৭১ শতাংশ কমেছে। কর্মসংস্থানের ওপর এই সংকটের প্রভাবও গভীর, ২০২৩ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বরে বেকারত্ব ৪.৪৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬.৬ লাখে।
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণের পরিবর্তে শিল্পের কার্যক্রম সংকুচিত করার নীতির দিকে এগোনো হচ্ছে।
শিল্প ও ব্যবসার স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারকে অবশ্যই বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপচয় হ্রাস, বিদ্যমান সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। অন্যথায়, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে শিল্প খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি এক গভীর সঙ্কটের মুখে পড়বে।
