স্টাফ রিপোর্টার শাহীনুর হাসান :
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের ‘ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধনকুবের কারখানা কী বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে? বিশ্বের সবচেয়ে অধুনিক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ধনকুবের উৎপাদক কারখানার ধারক ও বাহক এখন বাংলাদেশ। প্রতিবেদন বলছে, এটা আশ্চর্যজনক যে ধনকুবের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকে চীন বিশ্বের এক নম্বর দেশ নয়। এ অবস্থান এখন বাংলাদেশের। সবাইকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ আজ সবার ওপরে।
ভাবা যায়! আমরা এখন খুব দ্রুতগতিতে ২৫২ কোটি টাকাওয়ালা মানুষ তৈরি করতে পারছি। ২০১২ সাল থেকে শুরু করে, গত আট-নয় বছরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়েও বাংলাদেশ বেশি ধনী মানুষ উৎপাদন করেছে। এসময়ে দেশে ধনী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৮ শতাংশেরও বেশি হারে, অথচ সারা বিশে^ যার গড় প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ।
খবরটা আনন্দের, নাকি দুঃখের? লজ্জার, নাকি গর্বের? আশার নাকি হতাশার? প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কথা বলছি, তখন ধনী মানুষ তৈরির মহাকর্মযজ্ঞ কোনো ইতিবাচক খবর হতে পারে না, বরং নিঃসন্দেহে বৃহৎ অর্থে নেতিবাচক। মুক্তবাজার একটি নির্মম ব্যবস্থার নাম। বিশ^য়ন একটি প্রচন্ড নিষ্ঠুরতার নাম। তবু আজকের বিশ্বে এই শব্দ দুটি সবচেয়ে বেশি জৌলুস ছড়াচ্ছে।
ফলে সেই নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায়, ধনীরা ক্রমাগত আরও ধনী আর গরিবরা আরও গরিব হয়ে উঠছে। রংপুর বিভাগে গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি। দারিদ্র হার সবচেয়ে বেশি এরকম ১০টি জেলার মধ্যে রংপুরেই ৫টি। কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, ও লালমনিরহাট, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, মাগুরা দেশের সবচেয়ে দারিদ্রপীড়িত অঞ্চল। আমাদের অর্থনীতির মূল সমস্যা সম্পদ নয়, বরং সম্পদের অসম বণ্টন।
প্রতিবেদন বলছে, আমাদের দারিদ্র্যও ব্যাপক অসমভাবে বণ্টিত। দেশে অঞ্চল ভেদে দারিদ্র হারের পার্থক্য বিদ্যমান। আজকের অর্থনীতি উন্নয়ন বলতে বোঝে সুষম উন্নয়ন। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে সুষম উন্নয়ন অনেকখানি প্রশ্নবিদ্ধ। এটা সত্য যে, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে। এটা প্রচন্ড আনন্দের। সেজন্য বাংলাদেশকে আন্তরিক অভিনন্দন। কিন্তু এভাবে বাংলাদেশ যদি ক্রমাগত একটি ধনকুবের তৈরির কারখানায় পরিণত হয় তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্ট হবে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
এক শ্রেণির মানুষের হাতে একসময় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়বে রাষ্ট্রের সমগ্র সম্পদ। ক্ষুধামুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়বে। সমাজে বৈষম্যরেখা আরো প্রশস্ত হতে থাকবে। ধনী রাষ্ট্র তৈরির প্রক্রিয়ায় হয়তো আমরা এগিয়ে যাব, তবে সুস্থ সুষম উন্নয়ন রাষ্ট্র বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় অনেকটা পিছিয়ে পড়ব। হতাশার খবর হলো, গত দেড় দশকে, প্রায় এক লাখ ধনকুবারের ভারত ছেড়ে চলে গেছে বিদেশে; বিদেশে অর্থপাচার করেছে, দেশের সম্পদ নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে ভিনদেশে।
বাংলাদেশেও একই ঘটনার সম্ভবনা উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। তবে সঠিক হিসেবটা আমাদের অজানা। একটি রাষ্ট্র যখন ধনীবান্ধব হয় তখন তা দীর্ঘ ও স্বল্প উভয় মেয়াদেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। একটি রাষ্ট্র যখন জনবান্ধব না হয়, বৈষম্যবান্ধব হয় তখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে উন্নয়ন বঞ্চিত হয়। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রয়োজন বৈষম্যহীন উন্নয়ন এবং তা অতি দ্রুততম সময়ে, এবং এখনই অর্থপাচার প্রতিরোধ করতে হবে, ধনকুবারদের বিদেশে যাওয়া বিদেশে পাড়ি জমানো বন্ধ করতে হবে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশে ক্রমাগত একটি বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় ক্রমাগত বৈষম্যের অন্ধকার নেমে আসছে। প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রকে বৈষম্যহীন করতে, সুষম উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে আমরা কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছি সেগুলো কি যথেষ্ট? যদি যথেষ্টই হবে তবে কেন বৈষম্যের পথ ক্রমাগত প্রশস্ত হচ্ছে? যদি আমরা আজ, এখনই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকর প্রয়োগিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারি, তবে খুব খারাপ সময় আসছে আমাদের জন্য। আমাদের প্রত্যাশা, আজকের বাংলাদেশ সারা বিশ্বে” বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের উদাহরণ হয়ে উঠুক। কেন আমরা ধনকুবের তৈরির দৃষ্টান্ত হচ্ছি? কেন আমরা স্বীকৃত ধনকুবের তৈরির কারখানায় পরিণত হলাম? তবেকী ধনকুবের কারখানা বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে? এটা আমরা চায়নি। আমরা চায়, বাংলাদেশ হোক সুষম উন্নয়ন ধারার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত।
সাম্য ও সমতার এক অনুসরণীয় কারখানা। তা না হলে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্ট হবে। অধিকারের প্রশ্নে আমাদের যে সমাজতন্ত্র তা বিনষ্ট হবে। মনে রাখতে হবে, কয়েকজন ধনকুবারের হাতে আমাদের সমগ্র সম্পদ জিম্মি হতে পারে না। আমরা তা হতে দিতে পারি না।
