আলো ডেস্ক এক্সক্লুসিভ: সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং দুদক কর্মকর্তার সঙ্গে ঘুস লেনদেনের অভিযোগের দুই মামলায় সাময়িক বরখাস্ত পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের ভাই মাহবুবুর রহমানকে কেন জামিন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। গতকাল সোমবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।
দুদকের আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালত মাহবুবুর রহমানের জামিন নিয়ে দুই সপ্তাহের রুল জারি করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এদিন আদালতে জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু। অন্যদিকে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৪ জুন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে (ঢাকা-১) কমিশনের পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ বাদী হয়ে চারজনের নামে মামলা করেন।
মামলায় ডিআইজি মিজান ছাড়াও তার স্ত্রী সোহেলিয়া আনার রতœা, ছোট ভাই মাহবুবুর রহমান ও ভাগ্নে পুলিশের কোতোয়ালি থানার এসআই মো. মাহমুদুল হাসানকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে তিন কোটি সাত লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও তিন কোটি ২৮ লাখ টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।
২০১৭ সালের ২৬ আগস্ট মাহমুদুল হাসান পুলিশের উপপরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি মিজানুর রহমান তার ভাগ্নে মাহমুদুল হাসানের নামে ২৪ লাখ ২১ হাজার ২২৫ টাকায় গুলশান-১ এর পুলিশ প্লাজা কনকর্ডে ২১১ বর্গফুট আয়তনের একটি দোকান বরাদ্দ নেন।
মিজানুর নিজে নমিনী হয়ে তার ভাগ্নে মাহমুদুলের নামে ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর একটি ব্যাংকে এফডিআর অ্যাকাউন্ট করে ৩০ লাখ টাকা জমা করেন। তবে দুদকের অনুসন্ধান চালু হওয়ার পর ওই টাকা ভাঙিয়ে সুদে এলে ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার ৫৭ টাকা তুলে ফেলেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, মিজানুর তার স্ত্রী রত্না রহমান কাকরাইলে এক হাজার ৭৭৬ বর্গফুটের একটি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট ক্রয়ে ২০১১ সালে চুক্তিনামা করে বিভিন্ন সময় ১ কোটি ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫০ টাকা নির্মাণ কোম্পানিকে পরিশোধ করেন।
পরে ২০১৬ সালে ফ্ল্যাটটি ভাগ্নে মাহমুদুলের নামে দলিল রেজিস্ট্রি করেন। মিজানুর রহমান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিয়ে গোপন করতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দ্বিতীয় স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করানোর অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া এক সংবাদ পাঠিকাকে প্রাণনাশের হুমকি ও উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে মিজানুরের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়।
এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠায় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মিজানকে। পরে তাকে পুলিশ সদরদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ওই বছরের ২৫ জুন সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী ডিআইজি মিজানকে সাময়িক বরখাস্ত করার প্রস্তাবে অনুমোদন দেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।
এর আগে ২০১৮ সালে একটি জাতীয় দৈনিকে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে এক সংবাদ পাঠিকাকে জোর করে বিয়ে করার সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার মুখে তাকে সাময়িক বরখাস্তের প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। ওই ঘটনায় পুলিশ সদরদপ্তরসহ দুদকে মিজানের অবৈধ সম্পদের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
অনুসন্ধান শেষে তার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিল করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। ডিআইজি মিজান ছাড়াও তার এক ভাই ও ভাগ্নের নামে করা সম্পদসহ চার কোটি দুই লাখ ৮৭ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর ২০২০ সালের ৮ জুন মিজান দাবি করেন, প্রতিবেদন পরিবর্তনের জন্য দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুস নেন। এর মধ্যে ওই বছরের জানুয়ারিতে প্রথমে ২৫ লাখ ও পরে ১৫ লাখ টাকা দেন। এর স্বপক্ষে মিজান তাদের কথোপকথনের কয়েকটি অডিও ক্লিপ একটি টেলিভিশনকে দিলে অডিও প্রচারের পর এ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ওইসময় বাছির দাবি করেন, তার কণ্ঠ নকল করে ডিআইজি মিজান কিছু ‘বানোয়াট’ রেকর্ড একটি টেলিভিশনকে দিয়েছেন। বিপরীতে মিজান দাবি করেন, সব জেনেবুঝেই তিনি এ কাজ করতে ‘বাধ্য হন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঘুস লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর তাদের দুজনকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ২০১৯ সালের ২২ জুলাই বাছিরকে গ্রেপ্তার করে দুদক। আর দুদকের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের মামলায় গ্রেপ্তার ডিআইজি মিজানকে পরে ঘুস লেনদেনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
