আলো ডেস্কঃ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গত ২৫ আগস্ট আরমান নামের এক যুবকের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে তার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করা একটি গ্রুপের সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- আহমেদ খান (২২), মো. হাসান ওরফে গুটি হাসান (২৪), মো. হানিফ হোসেন জয় (২৪), রমজান (২৩), মো. রাজু (১৯) উদ্ধার করা হয় ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত দেশীয় ধারালো অস্ত্র। পরবর্তীতে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মো. রাফিদুল ইসলাম রানা ওরফে রাফাত (২৩) ও তুষার হাওলাদার (২৩)।
র্যাব বলছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় গত ৪ থেকে ৫ বছর ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হামলা করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও কবজি বিচ্ছিন্ন করতো ১৫ থেকে ২০ জনের এই গ্রুপ। পরে এসব নৃশংসতার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের বিভিন্ন আইডিতে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিতো গ্রুপটি। এতে আতঙ্ক তৈরি করে আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন সময় ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি করতো তারা।
শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত বাগেরহাট ও রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে র্যাব-২ ও র্যাব-৬।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য কর্তৃক ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়। এসব সন্ত্রাসীদের হামলা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি ও মামলা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রুপের সন্ত্রাসীরা নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এক গ্রুপ অপর গ্রুপের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে মারামারি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে কতিপয় সন্ত্রাসী রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আরমান নামক এক যুবকের হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে তার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে। এই ঘটনায় ২৭ আগস্ট ভুক্তভোগী নিজে বাদি হয়ে রাজধানীর মোহাম্মদ থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন।
আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে র্যাব কর্মকর্তা জানান, আসামিরা রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য। তাদের গ্রুপে প্রায় ১৫-২০ জন সদস্য রয়েছে। ওই সন্ত্রাসী গ্যাংটি রাফাত, তুষার ও আনোয়ারের নেতৃত্বে বিগত ৪-৫ বছর যাবত পরিচালিত হয়ে আসছিল। আসামিরা মোহাম্মদপুর, আদাবর, বেড়িবাঁধ ও ঢাকা উদ্যান এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতো। এই গ্রুপের সন্ত্রাসীরা একাকী পথচারীদের আকস্মিকভাবে ঘিরে ধরে চাপাতিসহ ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনতাই করে দ্রুত পালিয়ে যায়। তারা বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজিসহ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকা উদ্যান, আদাবর, শ্যামলী, মোহাম্মদপুরসহ পাশ্ববর্তী এলাকায় দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে মারামারিসহ বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতো। তারা ওই এলাকাসমূহে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তির স্বার্থ হাসিলের জন্য ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী হিসেবেও কাজ করতো।
এছাড়াও তারা মাদক সেবনসহ বর্ণিত এলাকাসমূহে মাদক ব্যবসার সাথেও জড়িত ছিল। এই গ্যাংয়ে সদস্যরা রাস্তাঘাটে ইভটিজিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপ্রীতিকর ভিডিও শেয়ারসহ বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ কার্যক্রমের সাথেও জড়িত। এছাড়াও আসামিরা বর্ণিত কব্জি বিচ্ছিন্নের ঘটনার সাথে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য দেয়। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে আসামি তুষার ভুক্তভোগী আরমানের বাম হাতে চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়ে কব্জি বিচ্ছিন্ন করে এবং রাফাত ধারালো চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়ে ভুক্তভোগী আরমানের ডান হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন করে বলে জানা যায়।
ইতোপূর্বেও তারা বিভিন্ন সময়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ভুক্তভোগীকে একই কায়দায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হামলা করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করতো। পরে এ সব নৃশংসতার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিতো। আসামিদের বিষয়ে খন্দকার আল মঈন বলেন, মো. রাফিদুল ইসলাম রানা ওরফে রাফাতের নেতৃত্বে মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় বিগত ৪-৫ বছর যাবত একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ পরিচালনা করতো। সে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদান করতো ও এই গ্রুপের প্রধান হিটম্যান হিসেবে কাজ করতো। এই গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে সে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও বেড়িবাঁধ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতো বলেও জানা যায়।
সেই ঘটনার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেপ্তার এড়াতে সে প্রথমে ফরিদপুরের একটি মাজারে গিয়ে আত্মগোপন করে। সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করার পর পুনরায় গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ওই স্থান থেকে আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে বাগেরহাটে গমন করে। পরবর্তীতে বাগেরহাট থেকে অন্যত্র আত্মগোপনে যাওয়ার সময় র্যাবের হতে গ্রেপ্তার হয়। তার বিরুদ্ধে মারামারি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
গ্রেপ্তার তুষার হাওলাদার একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের একজন অন্যতম সদস্য। সে রাফাতের নির্দেশনা অনুযায়ী ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পরিকল্পনা করতো বলে জানা যায়। পরবর্তীতে গ্রুপের অন্যান্য সদস্যসহ তারা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতো বলে জানা যায়। এই ঘটনার পর সে রাফাতের সাথে আত্মগোপন করে এবং পরবর্তীতে বাগেরহাট থেকে র্যাব কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়। তার বিরুদ্ধে মারামারি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
গ্রেপ্তার হাসান ওরফে গুটি হাসান, হানিফ হোসেন জয়, রমজান ও রাজু এই সন্ত্রাসী গ্রুপের সহযোগী সদস্য। তারা গ্রেপ্তার রাফাতের নেতৃত্বে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতিসহ ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতো বলে জানা যায়। টার্গেট নির্বাচনের পর পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা ভুক্তভোগীকে নৃশংসভাবে হামলা করে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে বলে জানা যায়। তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর আদাবরসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও মিরপুর এলাকায় কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী বাহিনীরা সরব হচ্ছে, এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দমনে কি ব্যবস্থা নেবে এমন প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আল মঈন বলেন, ২০১৭ সালের র্যাব প্রথম কিশোর গ্যাং কালচার আবিষ্কার করে। আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। পদক্ষেপ নেয়ার পরও যারা এই সব কার্যক্রম থেকে অনেকে সরে আসছে না। কিশোর গ্যাং কালচারের সাথে জড়িত ১১’শ সদস্যকে আওতায় নিয়ে এসেছি। সারা বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং দমনে ও এর সাথে যারা জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে যে সব আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন তা নেয়া হবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই গ্রুপের পরিকল্পনাকারী রাফাত কোনো মোবাইল ফোনের সিম ব্যবহার করতো না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আইডি খুলে ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে সে ভুক্তভোগীদের হুমকি দিয়ে আসতো।
