আলো ডেস্ক: সরকার পতনে বিরোধী দলগুলোর এক দফার আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সরকার আদালতকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই লক্ষ্যেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা, জোবায়দা রহমানের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। গতকাল শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে ফরমায়েশি রায়ের প্রতিবাদ এ সমাবেশের আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ। মির্জা ফখরুল বলেন, এই সময়ে এ রায়টা কেন? মূলত দেশের মানুষ যখন পরিষ্কার করে ঘোষণা দিয়েছে- এখন আর অন্য কোনো দাবি নয়, দাবি সরকারের পদত্যাগ। ঠিক তখনই এক দফা দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার জন্যেই তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এ রায়।
প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করুন। দেশ ও জনগণের পক্ষে থাকুন। গুম করে খুন করে হয়রানি করে বাংলাদেশের মানুষের যে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা স্তব্ধ করা যাবে না এমন মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, এটি আমাদের অন্তর্গত শক্তি। একসময় মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। এখন গণতন্ত্রের জন্য, বাকস্বাধীনতা জন্য ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র বিশ্বাস করে না বাকস্বাধীনতা বিশ্বাস করে না। যদি বিশ্বাসই করত তাহলে তারা এ দেশকে গণতন্ত্রকামী রাষ্ট্র পরিণত করার জন্য চেষ্টা করত।
এরা দুইবার জোর করে ভোট করে দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে হাস্যকর অবস্থায় ক্ষমতা দখল করে আছে। আওয়ামী লীগ আবার পাঁয়তারা করে যাচ্ছে আগের মতো নির্বাচন করে তারা ক্ষমতায় যেতে চাচ্ছে এমন অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, তারা ডিসি এসপি রদবদল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এগুলো দিয়ে যাচ্ছে আবার জোর করে নির্বাচন করার জন্য। এবার আর সেটি হবে না বাংলাদেশের মানুষ জেগে উঠেছে। বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এদেশের গণতন্ত্র নেই। গত দুটি নির্বাচনে সম্পূর্ণভাবে চুরি ডাকাতি হয়েছে।
এবারের ভোটে অবশ্যই জনগণের মাধ্যমে ভোট দিয়ে নির্বাচিত হতে হবে। জানান তিনি। সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, কারণ এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, কারণ এখনই এরা ঘরে থাকতে দেয় না রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হয়রানি ও গ্রেপ্তার করা শুরু হয়েছে। গায়েবি মামলা দিয়ে যাচ্ছে। জামিন পাওয়ার পরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। মির্জা ফখরুল বলেন, স্রোতের মতো বন্যার পানির মতো মানুষ আসছে, মানুষের এই দুর্বার আন্দোলন তরঙ্গের পর তরঙ্গ সৃষ্টি করে একদলীয় শাসককে পরাজিত করতে হবে। আজ শুধু আমরা একাই নই, সব রাজনৈতিক দল বলছে এই সরকার থাকতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আজকে বিচার বিভাগের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি নিপীড়ন করা হচ্ছে। জামিন দিচ্ছে না এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, গায়েবি মামলায় কারাগারে আটক রাখা হচ্ছে।
কারাগারে আরেক নির্যাতন। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ২৪ ঘণ্টা লকআপে রাখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের হাতে কেউ নিরাপদ নয় এমন মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, গত কয়েক বছরে ৫৬ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। সহ¯্রাধিক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে লিখতে পারছে না। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গুলি করা হচ্ছে, হাতুড়ি দিয়ে হাত পা গুঁড়ো করে দেওয়া হচ্ছে। এর নামই কি গণতন্ত্র! সমাবেশে মির্জা ফখরুল বলেন, এবার দেশের মানুষ জেগে উঠেছে। তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এই দেশে গণতন্ত্র নেই। তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে, গত দুটি নির্বাচন চুরি, ডাকাতি হয়েছে, ভোট নিয়ে গেছে। এবার অবশ্যই জনগণের ভোটের নির্বাচন হতে হবে। এবার জনগণকে ভোট দিতে হবে।
কিন্তু এই সরকার যদি ক্ষমতায় থাকে তাহলে সেটি হবে না। এখন থেকেই তারা (সরকার) নির্যাতন, গুলি করতে শুরু করেছে। এখন থেকেই রাতে বাড়িতে থাকতে দেয় না। কিন্তু এভাবে আটকানো যাবে না। বন্যার পানি যেমন আসতে থাকে, তেমনি মানুষ আসছে। এই দুর্বার মানুষের আন্দোলন তরঙ্গের পর তরঙ্গ সৃষ্টি করে এদের (সরকার) চলে যেতে বাধ্য করা হবে। তারেক-জোবাইদার সাজার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ঠিক এই সময়ে এই রায়টি কেন? দেশের মানুষ যখন জেগে উঠেছে, তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত তাদের অধিকারের কথা বলতে শুরু করেছে, নদী, পাহাড়, পর্বত ডিঙিয়ে দাবি জানানোর জন্য আসছে, এই ফ্যাসিস্ট, গণতন্ত্রের শত্রæ, অবৈধ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে মানুষ জেগে উঠেছে, সেই সময় এই রায় দিয়ে সরকার জনগণের দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে।
আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। তারা (সরকার) বাংলাদেশর পক্ষে, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষে, ভোটের অধিকার পক্ষে কথা বলে সেই দলের নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দিতে চায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব পক্ষে যারা থাকবে তাদেরকে তারা (সরকার) নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। তারই ধারাবাহিকতায় এদেশের নেত্রীকে তারা গ্রেপ্তার করেছে, তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা-সাজা দিয়ে এই দেশপ্রেমিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, দেশের স্বাধীনতা-গণতন্ত্রকামী মানুষকে কোনো সাজা দিয়ে, মিথ্যা-গায়েবি মামলা দিয়ে, বন্দুক-পিস্তল দিয়ে জখম করে, নিহত করে, গুম করে তাদের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে স্তব্ধ করা যাবে না। এটা আমাদের অন্তর্গত শক্তি।
ফখরুল বলেন, আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছি এটি স্বাধীন দেশের জন্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য। আমরা পরবর্তীতে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি, লড়াই করেছি। আজকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম-লড়াই করছি। একটিই লক্ষ্য আমাদের, আমরা এই জনগণের জন্য স্বাধীন-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাই। এখানেই তাদের (সরকার) আপত্তি। কারণ, তারা দেশের স্বাধীনতা-গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। যদি করতো তাহলে তারা দেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা করতো। তারা (সরকার) দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে পর পর দুটি হাস্যকর নির্বাচন করে জোর করে ক্ষমতা দখল করে আছে। তারা আবারও এমন নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাওয়ার পায়তারা শুরু করেছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায়, ডিসি, এসপির পরিবর্তন, পোস্টিং, প্রশাসনের হাজার হাজার মানুষের পদোন্নতি।
যার অর্থ, আগের মতো প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা নির্বাচনী বৈতরণী পার হবে। কিন্তু এবার আর সেটা হবে না। আমরা এখন যে যুদ্ধে নেমেছি, যে সংগ্রামে নেমেছি, এটা বিএনপি, তারেক রহমান বা মির্জা ফখরুলের নয়, এই যুদ্ধ দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাধীনতা, ভোটের অধিকার ও বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষা করার।
ডাক্তার এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে ও সাংবাদিক কাদের গণি চৌধুরীর পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন পেশাজীবী নেতাদের মধ্যে সাংবাদিক কামাল উদ্দিন সবুজ, সৈয়দ আবদাল আহমদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের শহীদুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের অধ্যাপক লুৎফর রহমান, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, ডা. মো. মেহেদী হাসান, বাংলাদেশ শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া, অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স-এ্যাবের প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম রিজু, আলমগীর হাসিন আহমেদ, প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম, আসাদুজ্জামান চুন্নু, অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম, উমাশা উমায়ন মনি চৌধুরী, মেহেদী হাসান সোহেল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপস্থিত অধ্যাপক মো. শামসুল আলম, অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম ও অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম, সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কাগজী।
