আলো ডেস্ক:
মৌলিক সংস্কারের যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো করে ‘অতিদ্রুতই নির্বাচনের পথে সরকার এগোবে’, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ‘শহীদের স্মরণে’ এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস যে, এত সমস্যার পরেও ১২টা মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য এসছে, বাকিগুলোতে ঐকমত্যে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। প্রতিদিন বৈঠক হচ্ছে কয়েক ঘন্টা ধরেৃঅনেকগুলো বিষয় আছে যেগুলো আমরাও ঠিক বুঝি না যে তারা যেগুলো করতে চান।
“আমার মনে হয়, এগুলোকে বাদ দিয়ে যে মৌলিক বিষয়গুলো আছে সেই বিষয়গুলোর সমাধান করে অতিদ্রুত, নির্বাচনের যেটা মোটামুটি ধারণা পাওয়া গেছে লন্ডনে তারেক রহমান সাহেব এবং আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকের মধ্য দিয়ে, যে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে নির্বাচনটা হবেৃআমার মনে হয় সেটা হলেই বোধহয় অনেক সমস্যা, অনেক দ্বিধা কাটিয়ে আমরা একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারব।”
রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফার সংলাপ চলছে। জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে এই ধাপে ২০টি বিষয়ে ঐকমত্য অর্জন করতে চায় ঐকমত্য কমিশন। গত বুধবার পর্যন্ত ১৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। মির্জা ফখরুল বলেন, “আমি অনুরোধ করব এতটা হতাশ হবেন না, নিরাশ হবেন না। আমরা যদি পারি অতীতে, আমরা যদি সেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সফল হতে পারি, ঊনসত্তরে সফল হতে পারি, একাত্তরে সফল হতে পারি, চব্বিশে সফল হতে পারি, সকল সীমাবদ্ধতাসহ, তাহলে আমরা এটাও পারব। এটা আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করি বলেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব।”
তিনি বলেন, “আমি কারো সমালোচনা করতে চাই না। আজকে যে সময়টা এই সময়টা হচ্ছে, পারস্পরিক একটা বুঝাপড়ার সময়। একটু বুঝে নিয়ে, পরস্পরকে বুঝে আমরা যদি খুব দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে ফলটা লাভ করবে জনগণ, তার একটা প্রতিনিধিত্ব থাকবে, তার একটা সরকার তৈরি হবে।” এতে যে দেশের সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, সমস্যা মিটে যাবে না, তাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
তবে এতে যে একটা রাস্তা তৈরি হবে সে কথা তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “যে রাস্তার মধ্য দিয়ে আমাদের কথাগুলো, জনগণের কথাগুলো সেই সরকারের কাছে পৌঁছবে, পৌঁছাতে পারবে, সেই জায়গাটাতে আমরা যেতে চাই।” তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক একটা বোঝাপড়া থাকতে হবে, এই বোঝাপড়া না থাকলে এই যে আমরা কাদা ছোড়াছুড়ি করছি, গণতন্ত্রে কাদা ছোড়াছুড়ি হবে, অনেক কথা আসবে, কিন্তু এর একটা সীমা থাকা দরকার। “তা না হলে যেটা হয়, একটা তিক্ততা সৃষ্টি হয়, যে তিক্ততা ভবিষ্যতে গিয়ে রাজনীতিকে আরও কুলষিত করে।”
জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই আলোচনা সভা হয়। আলোচনা সভার আগে ১৫ বছরে ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী আন্দোলন ও জুলাই অভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের ওপর সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতনে ওপর আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বিএনপি মহাসচিব। জাতীয় প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
এরপর জাতীয় প্রেস ক্লাব দৈনিক যায় যায় দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ইংরেজি দৈনিক নিউজ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর ও দৈনিক সংগ্রামের সাবেক সম্পাদক আবুল আসাদকে সন্মাননা দেয়। জুলাই-অগাস্ট অভ্যুত্থানে ‘শহীদ’ দুইজনের পরিবারের সদস্যদেরও সন্মাননা দেওয়া হয়।
এছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য এজেডএম জাহিদ হোসেনকে বিশেষ সন্মননা দিয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটি, যা তাদের হাতে তুলে দেন ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ। এ সময় জুলাই অভ্যুত্থান দমাতে আওয়ামী লীগ সরকারের চালানো দমনের পীড়নের নৃশংসতার কথা তুলে ধরে আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েন ফখরুল।
তিনি বলেন, “আজকে এখানে একজন মা তার ছেলের ছবি দেখালেন যে শহীদ হয়ে গেছে, আরেকটা ছোট ছেলে গতকাল আশুলিয়ার অনুষ্ঠানে আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, ওর বয়স ৬/৭ বছর হবেৃ আমার মাথায় না খুলিটা নেই। খুলিটা প্লাস্টিকের, অর্থাৎ গুলিতে তার মাথার খুলি চলে গিয়েছিল। পরে ডাক্তার সাহেবরা সেটাকে প্লাস্টিক দিয়ে আর্টিফিশিয়াল খুলি তৈরি করে লাগিয়ে দিয়েছে।
“এর চেয়ে বড় ত্যাগ আর কি হতে পারে? আমি আসলে মাঝে মাঝে একটু আবেগ প্রবণ হয়ে পড়ি। এটার (অভ্যুত্থান) মূল্য, যেটা আমরা দিয়েছি, এটা (দেশ গড়ার কাজ) যদি সঠিকভাবে করতে না পারি তাহলে ওই শিশুদের সামনে, আমার বোনের সামনে, মায়ের সামনে তাহলে আমরা জাতির সঙ্গে নিসন্দেহে একটা বড় প্রতারণা করব। আমি আশা করব সেই পথে আমাদের যেতে হবে না।
নিঃসন্দেহে আমরা সামনের দিকে একটা সুন্দর বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।” ২০১৪ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবের একদিন অবরুদ্ধ থাকার পর গ্রেপ্তারের ঘটনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমার অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা আমি আর বর্ণনা করতে চাই না। কারণ সেটা আমার জন্যে সুখের নয়, আনন্দের নয়। তবে এটাকে ওইসময়ে স্বাভাবিক মনে করেছি।”
“যখন আমি ক্লাবের ফটকের বাইরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোহার বড় বড় হাতুড়ি দিয়ে গাড়িটাকে পেটানো শুরু হল-আমার তখন ওই মুহূর্তে মনে হয়েছিল যে, আর বোধহয় জীবন্ত অবস্থায় আমি ফিরে যেতে পারব না। যাই হোকে ফিরে এসেছিৃ. আপনাদের সামনে কথা বলছি। আমরা যারা গুটিকতক সৌভাগ্যবান যারা এখনো আমরা বেঁচে আছি, আপনাদের সাথে বলার সুযোগ পাচ্ছি।
আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, এই যে বোন কথা বললেন, উনার কান্না কি করে বন্ধ করতে পারি, উনি যে শিশুটির ছবি দেখালেন যে শহীদ হয়ে গেছে।”
‘এটা কি মগের মুল্লুক’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, “যথেষ্ট হয়েছেৃ বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ সাহেব তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করেছিলেন ওই সময়েও এরকম বিশৃঙ্খল অবস্থা ছিল স্বৈরাচারের পতনের পরে।”
“এখন কি হচ্ছে, এখন কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা মগের মুল্লুকের মধ্যে আমরা চলছি। এটা থেকে বের হয়ে আসতে হলে ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সাপ্তাহের মধ্যে জনগণকে (ভোট) অধিকারটা প্রয়োগ করার সুযোগটা সৃষ্টি করে দিয়ে সসন্মানে বিদায় হোন।
“আমরা যেটা বলতে পারি, সাহাবুদ্দিন সরকারের মত ইউনূস সাহেবের সরকার ছিল। কাজেই দয়া করে জনগণের অর্জনকে কুক্ষিগত করে শেখ হাসিনার মত পলায়নের রাস্তা তৈরি করবেন না।”
একটি দলের নেতাদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “৭৫ বছরের রাজনীতিবিদ, ৬০ বছরের রাজনীতিবিদ তাদের নিয়ে আপনারা সমালোচনা করেন, স্বাধীনতার ঘোষকের ছবি নিয়ে অবমাননা করেন, জাতীয় নেতৃবৃন্দ নিয়ে আপনারা কথা বলার সময়ে আপনারা আয়নায় চেহারা দেখেন না।”
