জুলাই গণঅভ্যুত্থান: বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনে প্রতিবন্ধী নাগরিকের অংশগ্রহণ শির্ষক মতবিনিময় সভা
স্টাফ রিপোর্টার
গত শুক্রবার ২৫ জুলাই ২০২৫ বিকাল ৩:৩০ টায় রাজধানীর বাংলামটরস্থ জাতীয় নাগরিক পার্টির কার্যালয়ের মিলনায়তনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হয় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনে প্রতিবন্ধী নাগরিকের অংশগ্রহণ’ শির্ষক মতবিনিময় সভা। উল্লেখিত সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক উইং এর আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃবৃন্দ, জাতীয় নাগরিক পার্টির সংগঠকবৃন্দ এবং সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সমাজে হিজড়া, দলিত, হরিজন, চাঁ শ্রমিক ও গার্মেন্টস শ্রমিক— সবাই নিজ নিজ চাহিদা ও ন্যাজ্যতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত। তাই বিভিন্ন দাবি এবং প্রতিবাদে আমরা তাদের রাজপথে দেখতে পাই। আমাদের ভাবতে হবে, প্রতিবন্ধী মানুষ কেন অদৃশ্য? দায় কার? জুলাই বিপ্লবের পরও আমাদের দেশে হিজড়া, নারী, আদিবাসী, হরিজন, ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মানুষদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সংলাপে, বক্তব্যে বা লেখনীতে স্মরণ রাখলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা সব জায়গা থেকে বাদ পড়ে যায়। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলসহ সুশীল সমাজ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে প্রায়শই প্রান্তিকতার হিসাব করছেন! তাহলে প্রতিবন্ধী মানুষদের দাঁড়াবার জায়গা কোথায়? বাস্তবতা হচ্ছে আধুনিকতা প্রতিবন্ধিতাকে কোন পলিটিকাল স্পেসে স্থান দেয়নি।
কারণ সমাজের চোখে আমরা ভিক্ষুক। আমরা রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর কোন স্তরে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী হিসেবে অবস্থান তৈরি করতে পারিনি। আজকের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদেরকে এক অপ্রতিরোধ্য পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষের সংগ্রামকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চিন্তা ও কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদেরকেই অর্থাৎ প্রতিবন্ধী নাগরিকদের কেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। জুলাই-এর শক্তি হিসেবে, নতুন দিনের নেতৃত্বের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক উইং গঠন করেছে। এখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই নেতৃত্ব দিবে, নিজেদের দাবি আদায়ে, দেশ গঠনে, এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আমজাদ হোসেন, সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি’র প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক উইং। তিনি তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুস সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের বেড়াজালে সম্মুখীন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি নতুন দিশা দেখাতে পারে। আমাদেরকে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে করুণা, ভিক্ষার দুয়ারের পরিবর্তে রাজনৈতিক শক্তিতে রুপান্তর করতে হবে।
মুহাম্মদ ইফতেখার মাহমুদ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠক ও সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক উইং বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে সংগঠিত হয়ে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদেরকে প্রমান করতে হবে। এজন্য আমাদেরকে সকল দ্বিধা ভুলে নিজ নিজ রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলে যুক্ত হয়ে নতুন বৈষম্যহীণ বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। জুলাই-এ যেমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা রাস্তায় নেমে অংশ নিয়েছে, এখন দেশ গড়ার কাজেও অংশ নিবে।
সাইফুর রহমান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠক ও সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক উইং বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক অধিকার চর্চার জন্য সঠিক কোন প্লাটফর্ম বা রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা কখনোই পায়নি, সেই সুযোগটি এনসিপি আমাদেরকে করে দিয়েছে। আমরা বিশ্বাষ করি আমাদের যগ্যতা দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করবো ইনশাল্লাহ।
বাপ্পী সরকার, সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক উইং বলেন আমাদেরকে লড়াই-এর মাঠে থেকেই আমাদের অধিকার অর্জন এবং বৈষম্যের বেড়াজাল ভেয়্গে ফেলতে হবে। সময় এসেছে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিবন্ধী মানুষদেরকে প্রমাণ করার। এনসিপি’র মাধ্যেেমই আমরা দেশ গঠনের নেতৃত্বে অংশ নিবো।
আব্দুস সালাম মজনু, প্রধান সমন্বয়কারি, পীরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় নাগরিক পার্টি ও সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক উইং বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও মূল ধারার রাজনীতি করতে পারে। আমি যেমন আমার রংপুরের পীরগঞ্জের দায়িত্ব নিয়েছি। তেমনি যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও নিজ নিজ এলাকার রাজনীতিতে অংশ নিয়ে নেতৃ্ত্েবর স্বাক্ষর রাখার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া আমাদের জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক উইং তো থাকলোই। সকল প্রতিবন্ধী ভাই-বোনদেরকে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দানের আহ্বান করছি।
চেনবানু, সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক উইং বলেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। যদি প্রয়োজন পড়ে আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও রক্ত দিয়েও বাংলাদেশকে ফ্যাসিস্ট মুক্ত করব ইনশাআল্লাহ। আসুন আমরা সবাই দলমত নির্বিশেষে এক হয়ে দেশটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলি। আমরা সবাই যোগ্য লোকের শাসন চাই বৈষম্যহীন দেশ চাই এ্যাডভোকেট যায়েদ বিন নাসের, সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রতিবন্দী ব্যক্তিদেরকে এনসিপির পাশে পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি প্রতিবন্দী ব্যক্তিদেরকে বৈষম্যহীণ বাংলদেশ গড়তে সার্বাত্মক প্রচেষ্টা জারি রাকভেন বলে অঙ্গীকার পূনর্ব্যক্ত করেন।
রিয়াজ মোর্শেদ, যুগ্ম মূখ্য সমন্বয়ক বলেন দেশের অণেক শ্রমিক কাজ করতে গিয়ে প্রতিবন্ধিতা বরণ। করেন। দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে এবং তৃণমূলের প্রতিবন্দী ব্যক্তিদের সংগঠিত করতে শ্রমিক উইং সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। এছাড়াও তিনি পরবর্তিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন পরিবর্তন করে দেশকে প্রতিবন্দী ব্যক্তিসহ কলের উপযোগি করতে কাজন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
নাভিদ নওরোজ শাহ্, যুগ্ম মূখ্য সমন্বয়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রতিবন্ধী মানুষদেরকে করুণার চোখে দেখে না। বরং পিছিয়ে থাকা এই মানুষদেরও অধিকার রয়েছে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার। এনসিপি তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উইং করে সারা দেশের বঞ্চিত, নীপড়িত, শোষিত প্রতিবন্ধী মানুসদেরকে সংগঠিত করে রাজনৈতিক বর্গ হিসেবে দেশের মানুষদের কাছে প্রমাণ করতে চায়। সেক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষদের আন্দোলনের সাথে ছাত্র সময় যুক্ত থেকে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির কথা জানান। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমতা না হলে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ হবে না বলে তিনি সকল সংগ্রামে পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
উপস্থিত প্রতিবন্ধী মানুষদের কাছ থেকে নিম্নোক্ত দাবি উঠে আসে:
১ আমাদেরকে বিচ্ছিন্নতার ভার থেকে মুক্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোট ব্যাংক হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রমাণ করতে হবে।
২ রাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর হয়ে আওয়াজ তুলতে হবে।
৩ সমাজের কুসংস্কার ও প্রথাগত ধারণা ভেঙে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে সর্বস্তরে দৃশ্যমান এবং কার্যকরী উপস্থিতি বাড়াতে হবে।
৪ সমাজের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে রাজনৈতিক দলগুলোর ও রাষ্ট্রীয় গঠনতন্ত্র, ইশতেহার ও নীতিমালায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
