রাজশাহীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের তথ্য ফাঁস, কোচিং-এর ফোনকলে অতিস্ট অভিভাবক
মো: ফায়সাল হোসেন
স্কুল-কলেজে ভর্তির সময় ফরমে সকল প্রকার তথ্য লিখতে হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য মোবাইল নাম্বারও দেয়া থাকে, আর সেই মোবাইল নাম্বার সহ শিক্ষার্থীদের শ্রেণী অনুযায়ী তথ্যগুলো যখন কোচিং সেন্টারের কাছে চলে যায়।
কোচিং সেন্টার থেকে অভিভাবকদের মোবাইলে কল দিয়ে নিজ নিজ কোচিং এর গুনাগুন প্রকাশ করে ভর্তির জন্য অনুরোধ করে, এটা কোচিং সেন্টারগুলোর মার্কেটিং সেক্টরের কাজ। কিছু কিছু কোচিং সেন্টারে ফোনকল করার জন্য আলাদা স্টাফ নিয়োগ দেয়। কিন্তু কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষার্থীদের নাম ও তাদের অভিভাবকদের মোবাইল নাম্বার পায় কিভাবে এমন প্রশ্ন নিয়ে অনুসন্ধানে “কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হয়ে আসে”।
অনুসন্ধানে নগরীর প্রায় সব সরকারী, বেসরকারী, প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ হয় প্রতিবেদকের কাছে। যেসব তথ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কোচিং সেন্টারগুলো বিভিন্ন কলা-কৌশলে সংগ্রহ করে থাকে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েব সাইটে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের মোবাইল নাম্বার সহ বিস্তারিত লিখা থাকে, যেগুলো সাধারনত বাইরের কেউ পাওয়ার কথা না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু শিক্ষক-কর্মচারীর মাধ্যমে এসব তথ্যগুলো ফাঁস হয়ে যাচ্ছে এবং চলে যাচ্ছে নগরীর বিভিন্ন কোচিং সেন্টারগুলোতে।
তথ্য ফাঁসের বিষয়ে লক্ষ্মীপুর বহুমুখী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা, আইরিন জাফর সাক্ষাৎকারে বলেন,এই তথ্য বাইরে যাবার কোন সুযোগ নাই, আপনার কাছে কিভাবে গেল বুঝতে পারছি না।
তথ্য ফাঁস হবার বিষয় নিয়ে নগরীর পিএন সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি, তবে স্বীকার করেছে কিছু অভিভাবক তাকে জানিয়েছে কোচিং সেন্টার থেকে ফোন দেয় এবং তাদের মোবাইল নাম্বার কিভাবে পায়। প্রধান শিক্ষিকা এবিষয় নিয়ে স্কুল কম্পিউটার অপারেটরের সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলেন, স্কুলের কম্পিউটার অপারেটর অত্র স্কুলের ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক এনামুল হক। তবে তিনি পরীক্ষার ডিউটিতে থাকায় তার সাথে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ হয়নি, পরে তিনি স্কুলের টেলিফোন থেকে কল দিয়ে তথ্য ফাঁস করার বিষয়টি তিনি অবগত নন বলে জানায়। তবে তিনি ইসলাম শিক্ষার শিক্ষক হয়ে কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।(পিএন স্কুলের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত প্রকাশিত হবে)।
একই ঘটনা সিরোইল সরকারী হাই স্কুল, হেলেনাবাদ সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, লক্ষীপুর বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শহীদ নজমুল হক উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুল, রাজশাহী সরকারী মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, মসজিদ মিশন স্কুলসহ প্রায় সব স্কুলের। কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পিডিএফ ফাইল এমনকি শ্রেণী হাজিরা খাতারও কপি পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে সিরোইল স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি পিডিএফ কপি দেখে আশ্চর্য হন এবং স্বীকার করে স্কুলের কেউ এটা ফাঁস করেছে। ভবিষ্যতে এধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে বিষয়ে তিনি সচেতন থাকবেন।
হেলেনাবাদ সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বলেন,“আমরা নবম শ্রেণির ছাত্রীদের তালিকা তাদের সুবিধার্থে নোটিশ বোর্ডে দিয়েছিলাম হয়তো সেখান থেকে ছবি তুলে নিতে পারে”। তবে দশম শ্রেণির তালিকা ফাঁস কিভাবে হয়েছে সেটা তিনি জানেন না।
একই কথা বলেন লক্ষীপুর বহুমুখী বালিকা বিদ্যালয় এবং শহীদ নজমুল হক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক-শিক্ষিকাগন।
তবে কোচিং সেন্টার থেকে গোপন সুত্রে পাওয়া তথ্য মতে কোচিংএর পরিচালক ও মার্কেটিং অফিসারসহ অনেক স্টাফ সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক ও কম্পিউটার অপারেটরদের সাথে যোগাযোগ করে এসকল তথ্য সংগ্রহ করে। সেক্ষেত্রে কিছু শিক্ষক ও কম্পিউটার অপারেটর বা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা এসকল তথ্য বিভিন্ন কৌশলে বিভিন্ন দামে বিক্রি করে।
ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে মোবাইল নম্বরে প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, আমাদের কাছে প্রায়ই কোচিং সেন্টার থেকে ফোন আসে তারা আমাদের ছেলে-মেয়েদের তাদের কোচিং সেন্টারে পড়ার জন্য অনুরোধ করে। পিএন স্কুলের দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর পিতা জানান, “আমি চিকিৎসক প্রায় সময়ই রোগী দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকি, স্কুলে আমার মোবাইল নাম্বার দেয়া আছে। কোচিং সেন্টার থেকে প্রায়ই আমাকে ফোন দেয়, তবে আমার মোবাইল নাম্বার কোচিং সেন্টারগুলো কিভাবে পেল” এই প্রশ্ন সকল অভিভাবকদের। অনেক অভিভাবক স্কুলে বললেও বিষয়টি নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দেয়নি। প্রতিবেদকে তারা এবিষয়ে সঠিক সমাধানের জন্য আশা ব্যক্ত করেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তথ্য ফাঁস হবার বিষয় নিয়ে উপ-পরিচালকের কার্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা, রাজশাহী অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহা: আব্দুর রশিদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “নি:সন্দেহে এটা অন্যায় কাজ, আমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বলবো এ বিষয়ে আরও সর্তক হতে।” তিনি নিজেও স্বীকার করেন যে কোচিং ফোন কলের তিনিও স্বীকার।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) টুকটুক তালুকদার বলেন,“বিষয়টি আমার জানা ছিলনা এখন জানলাম, আমি জেলা প্রশাসক সারের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
শিক্ষা নগরীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোচিং বাণিজ্য, সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সরকারি চারটি প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও এসকল অনিয়মের লাগাম ধরার স্বদিচ্ছা কারোই কখনো দেখা যায়নি।
