নগরীতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চলছে প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: নীরব কর্তৃপক্ষ
মো: ফায়সাল হোসেন
শিক্ষা নগরী হিসাবে রাজশাহী সারাদেশে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন আসে শিক্ষা নগরীতে তাদের সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজশাহী নগরীতে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর এসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে অনিয়ম যা দেখার কেউ নাই।
অর্ধশতাধিক প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে নগরীতে যাদের কোন অনুমোদন নাই। এমনকি শিক্ষা বোর্ডের নিকট থেকে তাদের পাঠদানের অনুমোদনও নাই। মাধ্যমিক লেভেলে ভর্তি নিলেও মাধ্যমিকের পাঠদানের অনুমোদন নাই। শিক্ষা বোর্ডের কাছে নগরীর প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন তালিকা নাই, তারা জানেও না কয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের স্কুল পরিদর্শক মোহা: জিয়াউল হক জানান “রাজশাহী শহরে কয়টা প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে সেটার তালিকা আমাদের কাছে নাই। কারন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের জন্য কোন আবেদন আমার কাছে কেউই জমা দেয়নি । মাধ্যমিক লেভেলে ভর্তি করিয়ে অন্য স্কুল থেকে রেজিষ্ট্রেশন করায় এটা সঠিক কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সঠিক না। এটার কোন অনুমোদন শিক্ষা বোর্ড দেয় না। ২০২০ সালের আগে মাধ্যমিকের পাঠদানের অনুমোদন দিতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০২০ সাল থেকে অনুমোদন দেয় শিক্ষা বোর্ড। ২০২২ সাল থেকে শিক্ষা বোর্ডের স্কুল পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি, আমার জানামতে কোন স্কুল মাধ্যমিকের জন্য আবেদন ও করেনি।”
তিনি আরও জানান “রাজশাহী নগরীর অতি পরিচিত স্কুলগুলোর মাধ্যমিকের পাঠদানের অনুমোদন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাই। তবে সৃষ্টি সেন্ট্রাল স্কুল এন্ড কলেজ অনুমোদনের জন্য চেষ্টা করছে। অনুমোদন না থাকলেও মাধ্যমিকে তারা ভর্তি নিয়ে অন্য স্কুলে রেজিষ্ট্রেশন করিয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ায় এবং তাদের সনদ ও হয় ঐ সকল স্কুলের।”
এ বিষয় নিয়ে সৃষ্টি সেন্ট্রাল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ জানান “আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমিকের অনুমোদন নাই আমরা খুব শীঘ্রই অনুমোদন নিবো সেটার প্রক্রিয়া চলছে।” তিনি আরও বলেন “আমাদের শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট অনেক ভালো, গোল্ডেন এ প্লাস অনেক শিক্ষার্থী পেলেও প্রশংসাপত্রে আমার স্কুলের নাম থাকে না, এজন্য খুব খারাপ লাগে। ”নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিবাবক বলেন,আমি জানতাম না সৃষ্টি স্কুলের মাধ্যমিকের অনুমোদন নাই তারা মফস্বলের স্কুল থেকে রেজিষ্ট্রেশন করিয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ায় এমনটা জানলে আমি সৃষ্টি স্কুলে ভর্তি করাতাম না।
বেশি টাকা দিয়ে অন্য স্কুলের সার্টিফিকেট নিবো এটা ঠিক না, প্রতিষ্ঠানের উচিত ভর্তির সময় জানিয়ে দেয়া। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে সৃষ্টি স্কুলের অধ্যক্ষ বলেন আমরাতো ভর্তি করার সময় জানিয়ে দিই।”
সৃষ্টির পাশেই ইম্পেরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ এটার কোন অনুমোদন নাই তবে এবিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি অধ্যক্ষ। অনুমোদনের বিষয়ে তিনি বলেন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স আছে আর সাবেক এমপি ফজলে হোসেন বাদশা অনুমতি দিয়েছে। তবে ফজলে হোসেন বাদশা কি অনুমোদন দিয়েছে সেটা বলেননি।
এমন অবস্থা নগরীর প্রতিটা প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের জায়গাটাও নাই। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষক ও নাই। এবিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড রাজশাহীর চেয়ারম্যান আ ন ম মোফাখ্খারুল ইসলাম বলেন “শিক্ষা বোর্ডের কাছে প্রাইভেট স্কুল গুলোর কোন তালিকা নাই, এখন অনলাইনে রেজিষ্ট্রেশন হয়, শিক্ষার্থীরা তাদের স্কুল থেকে রেজিষ্ট্রেশন করে, আমরা সেভাবেই দেখি, তবে এক স্কুলে পড়ে অন্য স্কুলে রেজিষ্ট্রেশন করে সেটার জন্য প্রথমে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। আমাদেরকে অনেক স্কুল-কলেজ নিয়ে কাজ করতে হয় সেজন্য এবিষয়টা সেভাবে দেখার সুযোগ হয়না। তবে চেষ্টা করবো এসমস্যাটা সমাধানের।”সব
চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা নিরাপদ। নগরীর বিভিন্ন বহুতল ভবন ভাড়া নিয়ে গড়ে উঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোন প্রকার দূর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার পাওয়া মুশকিল। কোন কারন বশত যদি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগে তাহলে শিক্ষার্থীদের প্রাণনাশের আশংকা সবচেয়ে বেশি। কারন এসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি নির্বাপক ব্যাবস্থার কোন উপকরণ নাই। জরুরীভাবে বের হবার সিঁড়ি ও নাই, সেই সাথে শিক্ষার্থীদের অগ্নি প্রতিরোধী কোন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়না। সৃষ্টি, শিক্ষা, শিমুল মেমোরিয়ালসহ অর্ধশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একই অবস্থা।
এ বিষয়ে রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর সিনিয়র স্টেশন অফিসার আবু সামা বলেন “আমরা বহুতল ভবন নির্মাণের সময় নিয়মানুযায়ী নকশা অনুমোদন দিয়ে থাকি পরবর্তীতে ভবন ব্যবহারকারীরা অগ্নীনির্বাপক ব্যাবস্থা রাখে কি না সেটা সেই ভাবে দেখা হয়না, ঐসব ভবনে যদি স্কুল কলেজ থাকে তারা যদি আমাদের অবগত করে, তাহলে আমরা অগ্নিনির্বাপক বিভিন্ন মহরা বা প্রশিক্ষণ দিতে পারবো, তবে আমরা সঠিকভাবে বলতে পারবো না কোন ভবনে স্কুল কলেজ হচ্ছে যার কারনে আমরা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারিনা।
ভর্তি ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( শিক্ষা ও আইসিটি) টুকটুক তালুকদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন “বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে,কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে অবগতও করা হয়েছে, আশা করি দ্রুত এই সমস্যা গুলো সমাধান করা হবে।”
